স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে বুঝবেন যেভাবে

স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে বুঝবেন যেভাবে

স্বাস্থ্য

জুন ২৩, ২০২২ ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

ঘুমের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য একটি গুপ্তঘাতক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় স্লিপ অ্যাপনিয়া। যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ধরন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। বাংলাদেশে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে।

এ রোগ সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষেরই ধারণা কম। অনেকেই এ রোগে ভুগলেও বেশির ভাগ সময় ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন না। যাদের স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা আছে তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘুমে বারবার ব্যাঘাত ঘটে।

কোনো ব্যক্তি যদি ঘুমানোর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে হঠাৎ শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় আবার কিছু সময় পর তা শুরু হয়। এই যে শ্বাসপ্রশ্বাসের এই ব্যাঘাত ঘটাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ ঘুমের মধ্যে যখন জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে, তখন হঠাৎ করে শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার যখন শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়া হয়, তখন যে বাতাস বের হয় তাতে শরীর থেকে মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে যায়। কার্বন ডাই-অক্সাইডের লেভেল কমে গেলে একজন মানুষের শরীরে থাকা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর কিছুক্ষণ দম বন্ধ থাকার কারণে শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে আবার কার্বন ডাই-অক্সাইডের লেভেল বেড়ে গেলে তখন নার্ভাস সিস্টেম আবার উজ্জীবিত হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস ফিরে আসে। তবে এই পরিস্থিতিটা বেশ জটিল এবং এ ক্ষেত্রে অনেক সময় একজন মানুষের মৃত্যুও ঘটতে পারে।

অ্যাপনিয়া কত ধরনের হয়

মূলত দুধরনের অ্যাপনিয়া দেখা যায়। অবস্ট্রাকশন বা শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হলে তাকে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। গলায় টনসিল ফুলে গিয়ে এমনটা হতে পারে।

শ্বাসনালি এবং গলার সংযোগস্থলে অনেক সময় মাংসপেশি ফুলে যায়, যেটাকে অ্যাডনয়েড বলা হয়। এ ছাড়া অনেক সময় নাকের ভেতরে মাংসপেশি বড় হয়ে যায়। এ সমস্যাগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করে, যাকে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওজন বেশি বা শরীরে মেদ বেশি রয়েছে, এমন বয়স্ক মানুষ ও শিশু এই অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় বেশি ভোগে।

হৃৎপিণ্ড, ব্রেইন এবং নিউরো সমস্যা থেকে একজনের শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে নানা ধরনের জটিলতা হয় এবং তখন ওই ব্যক্তি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগতে পারেন। এ সমস্যা অনেক সময় জটিল এবং গুরুতর হয়। তবে দুই ধরনের অ্যাপনিয়াতেই মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে।

নাক ডাকলেই কী তাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা যায়?

ওজন বেশি হলে ঘুমের সময় শ্বাসনালিকে ঘিরে গলা এবং আশপাশের জায়গাগুলো সরু হয়ে যায়। এ ছাড়া নাকের মাংসপেশি অনেক সময় বড় হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে হাঁ করে নিশ্বাস নিতে হয় এবং তখন নাক ডাকার শব্দ হয়। তাই নাক ডাকলেই তাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা যায় না। তবে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্তরাও নাক ডাকে। তাদের ঘুমের মধ্যে সাধারণত জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয় এবং দম আটকে আসায় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।

বুঝবেন যেভাবে

যেকোনো ধরনের স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যাগুলো ঘুমের মধ্যে হয়, ফলে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। তবে ওই ব্যক্তির পাশে কেউ যদি ঘুমায়, তিনি হয়তো বুঝতে পারবেন। রোগীর পাশে ঘুমানো ব্যক্তি রোগীর লক্ষণগুলো খেয়াল করে তার সন্দেহের কথা জানালে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

পলিস মনোগ্রাফি বা স্লিপ টেস্ট করানোর মাধ্যমে বাংলাদেশেই এখন সঠিকভাবে অ্যাপনিয়া পরীক্ষা করা যায় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এ রোগের চিকিৎসা করা না হলে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড ও কিডনির ওপর চাপ পড়ে। তখন উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্‌রোগসহ জটিল সব রোগ দেখা দিতে পারে। আর আগে থেকে এসব রোগ থাকলে তা আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। এ রোগে রাতের ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটে, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

চিকিৎসা কী আছে

অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা হয় যে শ্বাসনালিকে কেন্দ্র করে কোন জায়গাগুলোতে বাধা আছে, পরে সেগুলো চিহ্নিত করে তা অপসারণ করতে হয়। এমন ক্ষেত্রে অল্প সময়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। কিন্তু জটিল স্লিপ অ্যাপনিয়া যেহেতু শরীরের অন্যান্য অনেক গুরুতর সমস্যা থেকে হয়, তাই এর চিকিৎসা আজীবন চালাতে হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

প্রতিরোধ করা কী সম্ভব?

চিকিৎসকরা মনে করেন যে সতর্ক থাকলে এ রোগ এড়ানো সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তারা।

প্রথমত, শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। আর তৃতীয়ত, সুষম খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ঘুমের মধ্যে বারবার দম বন্ধ হয়ে এলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবেই ভালো থাকা সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published.