শতবর্ষী মার্সেল দাপিয়ে বেড়ান পাহাড়-পর্বতে!

শতবর্ষী মার্সেল দাপিয়ে বেড়ান পাহাড়-পর্বতে!

ফিচার স্পেশাল

সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১ ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বের সেরা সেরা পর্বতারোহী তৈরির আঁতুড়ঘর আল্পস। বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দেশ হল সুইজারল্যান্ড। দেশটির মাথার মুকুট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত এই ‘আল্পস’। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, মোনাকো, ইতালি, লিচেনস্টাইন, অস্ট্রিয়া, জার্মানি হয়ে স্লোভেনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত আল্পস পর্বতমালার সবচেয়ে সুন্দর অংশটি আছে সুইজারল্যান্ডে। যাকে বিশ্ব বলে ‘সুইস আল্পস’।

সুইস আল্পসে আছে আল্পস পর্বতমালার বেশিরভাগ বিখ্যাত শৃঙ্গ। যেমন ডুফোরস্পিজ্জে (১৫২০৩ ফুট), দ্য ডোম (১৪৯১১ ফুট), দ্য লিস্ক্যাম ( ১৪৮৫২ ফুট), দ্য ওয়েইসহর্ন (১৪৭৬৩ ফুট) ও বিখ্যাত ম্যাটেরহর্ন (১৪৬৯১ ফুট)। আল্পস পর্বতমালায় চার হাজার মিটারের উঁচু শৃঙ্গ আছে ৮২টি। তারমধ্যে ৪৮টি শৃঙ্গই আছে সুইস আল্পসে। যদিও আল্পসের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মঁ ব্লাঁ ( ১৫৭৭৪ ফুট) আছে ইতালি-ফ্রান্স সীমান্তে। হিমালয়ের শৃঙ্গগুলোর তুলনায় উচ্চতায় অনেক খাটো এটি।

ছোটবেলাতে একা একাই পাহাড় বেয়ে উঠে যেতেন মার্সেল

ছোটবেলাতে একা একাই পাহাড় বেয়ে উঠে যেতেন মার্সেল

সুইজারল্যান্ডের পশ্চিমে আছে আল্পসের একটি রেঞ্জ, ‘ভডইস’ আল্পস। এ্ররই একটি বিচ্ছিন্ন উপত্যকায়, পাহাড়ের একেবারে কোল ঘেঁষে ছিল ছোট্ট একটি খামার বাড়ি। সেখানে বাবা ফ্রাঙ্কোইস রেমি, মা বার্থা ও ছোট দুই ভাইবোনের সঙ্গে বাস করত বালক মার্সেল। বিচ্ছিন্ন উপত্যকায় থাকার জন্য স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়নি তার। বাবা ফ্র্যাঙ্কোইস গ্লেসিয়ার গলা হিমশীতল পানি পাইপের সাহায্যে নিয়ে আসতেন খামারের জমিতে। চাষ করতেন গম, বার্লি, আলু, বিট, শালগম ও অন্যান্য সবজি। তাকে সাহায্য করতেন স্ত্রী বার্থা।

মার্সেলদের খামারে ছিল দশটির মতো গরু ও ছাগল। সবুজে মোড়া নয়নাভিরাম উপত্যকায় গরুগুলোকে চরাতে নিয়ে যেত আট বছরের মার্সেল। সেই সঙ্গে ডাকাবুকো মার্সেল বিপজ্জনক গ্লেসিয়ার পেরিয়ে উঠে পড়ত পাহাড়ের কিছুটা ওপরে। সেখান থেকে গরু ও ছাগলগুলোর ওপরে কড়া নজর রাখত। পাহাড়ের ওপর থেকে উপত্যকাটিকে দেখে মোহিত হয়ে যেত মার্সেল। ভাবত আরও ওপরে উঠলে হয়ত আরো ভালো দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে। মার্সেল প্রতিদিন একটু একটু করে আরো উঁচুতে উঠতে চেষ্টা করত। এভাবেই নিজের অজান্তে পাহাড়টির শৃঙ্গের দিকে এগোতে শুরু করেছিল মার্সেল।

শৃঙ্গের নিচে জমে ছিল টন টন বরফ। জমে থাকে সারা বছরই। এই জায়গাটা পেরোতে মার্সেলকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। বাবা ফ্র্যাঙ্কোইসের ছিল এক জোড়া কাঁটা মারা জুতা। কাদা রাস্তায় হাঁটার জন্য। বাবাকে লুকিয়ে সেই জুতা পাহাড়ে নিয়ে আসতে শুরু করেছিল মার্সেল। পায়ের তুলনায় জুতা জোড়া অস্বাভাবিক বড় হলেও, মার্সেলের পা বরফে আর পিছলে যাচ্ছিল না। এভাবেই ক্রমশ ওপরে উঠতে উঠতে একদিন মার্সেল অনুভব করেছিল, আর ওপরে ওঠা যাচ্ছে না। পাহাড়টা হঠাৎ যেন শেষ হয়ে গিয়েছে।

রেলে চাকরি করেছেন মার্সেল, তবে পাহাড়ে চড়ার কথা ভুলতে পারেননি তিনি

রেলে চাকরি করেছেন মার্সেল, তবে পাহাড়ে চড়ার কথা ভুলতে পারেননি তিনি

বালক মার্সেল আবিষ্কার করেছিল, পাহাড়টার পিছনদিকে আছে আরও সুন্দর একটি উপত্যকা। যেটিকে ঘিরে আছে অসংখ্য দুধসাদা পাহাড়। এই পাহাড়টার থেকে দূরের পাহাড়গুলো আরো বড়, আরো উঁচু। পাহাড়গুলোর কাছে পাখি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছা করছিল মার্সেলের। সে অনুভব করেছিল, দূরের পাহাড়গুলোর ওপর থেকে আরও সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে। বালক মার্সেল শপথ করেছিল, একদিন সে দূরের পাহাড়গুলোর মাথায় উঠবেই।

বাবা ফ্র্যাঙ্কোইস তখন উপত্যকায় রেললাইন পাতার শ্রমিকের কাজ করতেন। একদিন কাঁটামারা জুতা জোড়ার দরকার হয়েছিল। গুদামঘরে জুতা খুঁজে পাননি ফ্র্যাঙ্কোইস। তিনি আন্দাজ করেছিলেন জুতা গায়েব হওয়ার পেছনে কার হাত থাকতে পারে। সটান চলে গিয়েছিলেন মার্সেলকে খুঁজতে।

তখন গরুগুলো চরছিল উপত্যকায়। কিন্তু মার্সেলের দেখা নেই। আশেপাশের পাহাড় ও গ্লেসিয়ারগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎই ফ্র্যাঙ্কোইসের চোখ আটকে গিয়েছিল একটি পাহাড়ের গায়ে। পাথুরে পাহাড়টির গায়ে লেপটে থাকা বরফের ওপর দিয়ে, বানরের মত চার হাত পায়ে উঠে যাচ্ছে ১৬ বছরের মার্সেল। পায়ে ফ্র্যাঙ্কোইসের কাঁটামারা সেই জুতা জোড়া।

দুই ছেলেকে ছোট থাকতেই পাহাড়ে ওঠার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন

দুই ছেলেকে ছোট থাকতেই পাহাড়ে ওঠার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন

দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আতঙ্কিত বাবা, বন্ধ করে দিয়েছিলেন মার্সেলের গরু চরানো। গরু চরানোর লাঠি দিয়েই ফ্র্যাঙ্কোইস সেদিন বেদম পিটিয়েছিলেন মার্সেলকে। রেললাইন পাতার শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন মার্সেলকে। তবুও পাহাড় চড়ার নেশা ছাড়াতে পারেনি মার্সেল। কাজ থেকে পালিয়ে, কাঁটামারা জুতা ছাড়াই বরফের পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করত মার্সেল। ছোট বেলচা দিয়ে বরফে ধাপ কেটে। সব জানতেন মা বার্থা। মার্সেলকে বলতেন, “পড়ে মরবি কোনো দিন।” না, মার্সেল মরেনি। বরং মার্সেলকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মা বার্থা ও বোন লিলি।

বাড়ির কাছে পৌঁছে মার্সেল দেখেছিল সব শেষ। পাহাড় ধসের তলায় চাপা পড়েছে তাদের বাড়ি। বাড়িতে তখন ছিলেন মা ও বোন। মার্সেলের ভাই বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে গরু চরাচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাছে ছুটে যায় দুই ভাই। মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে ছুটে এসেছিলেন বাবা ও তার শ্রমিক সহকর্মীরা। বরফের স্তুপ সরিয়ে বের করা হয় মার্সেলের মা ও বোনের নিস্প্রাণ দেহ।

স্ত্রী ও মেয়ের মৃত্যুর পর কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছিলেন বাবা ফ্র্যাঙ্কোইস। চাষবাস ও গরুগুলোর দেখাশুনা করত ভাই। দুঃখ ভুলতে মার্সেল আঁকড়ে ধরেছিল পাহাড়কেই। বাধা দেওয়ার মত অবস্থায় ছিলেন না বাবা। রেলওয়ের কাজের অবসরে মার্সেলের বেশিরভাগ সময় কাটত পাহাড়ে। ছুটির দিন সামান্য কিছু খাবার নিয়ে উঠে যেত পাহাড়ে। নেমে আসত সন্ধ্যা বেলা। কখনো কখনো কনকনে ঠাণ্ডায় পাহাড়ের ওপর রাতও কাটিয়ে ফেলত মার্সেল। খোলা আকাশের নীচে মার্সেলকে সঙ্গ দিত রেলশ্রমিকদের স্লিপিং ব্যাগ। এভাবেই কেটে গিয়েছিল প্রায় এক দশক।

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন রেলের এক কপ্ররমচারী জিনাকে

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন রেলের এক কপ্ররমচারী জিনাকে

রেলপথ চালু হওয়ার পর রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পেয়ে যান যুবক মার্সেল। ট্রেনে চড়ে এলাকায় আসতে শুরু করেন শখের পর্বতারোহীরা। সঙ্গে নিয়ে আসতেন পাহাড়ে চড়ার সাজ সরঞ্জাম। তাদের পিছু নিতেন মার্সেল। উপযাচক হয়েই বলতেন, কোন রুটে কোন পাহাড়ে উঠলে পর্বতারোহীদের সুবিধা হবে। পর্বতারোহীরা যখন রোপ, আইস অ্যাক্স, ক্যারাবিনার, পিটন, হ্যামার নিয়ে জুতার নিচে ক্র্যাম্পন এঁটে পাহাড়ে উঠতে, তাদের পাশাপাশিই বিনা সরঞ্জামে পাহাড়ে উঠতেন মার্সেল। দেখতেন কোন সরঞ্জাম কীভাবে ব্যবহার করছেন পর্বতারোহীরা। তরতরিয়ে পাহাড়ে উঠতে থাকা মার্সেলকে দেখে, আরোহণ ভুলে তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন পর্বতারোহীরা।

মার্সেল জানতেন না তার পাহাড় চড়ার পদ্ধতিটিকেই বলা হয় ‘আলপাইন ক্লাইম্বিং’। পর্বতারোহণের সবথেকে সমীহ জাগানো পদ্ধতি। অনেকে বলেন পর্বতারোহণের আদি, অকৃত্রিম এবং সবথেকে নান্দনিক পদ্ধতি। নিতান্তই বাধ্য না হলে যে আরোহণ পদ্ধতিতে পর্বতারোহী ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করেন না। যে পদ্ধতিতে পর্বতারোহীর আরোহণের জন্য আগে থেকে পথে রোপ পাতা থাকে না। পর্বতারোহীদের পথ দেখান না কোনো ক্লাইম্বিং গাইড।

আগে থেকে পেতে রাখা ক্যাম্পে গরম খাবার নিয়ে অপেক্ষায় থাকে না কেউ। সঙ্গে থাকে না হাই অল্টিচিউড পোর্টার। নিজের শারীরিক সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মস্তিষ্কের ভরসায় আরোহণ করতে হয়। পরবর্তীকালে আলপাইন ক্লাইম্বিংকেই ভালবেসে ফেলেছিলেন মার্সেল। তাই সমস্ত ইকুইপমেন্টের ব্যবহার জানলেও, নিজের স্টাইলেই একা একা আরোহণ করতেন আল্পসের বিভিন্ন নামী ও অনামী শৃঙ্গে।

এখন হাজার হাজার মানুষকে ক্লাইম্বিং শেখান মার্সেল

এখন হাজার হাজার মানুষকে ক্লাইম্বিং শেখান মার্সেল

এদিকে ডাকাবুকো মার্সেল রেলওয়ের কর্মচারী যুবতী জিনার প্রেমে পড়ে গেলেন। নির্দিষ্ট একটি গ্লেসিয়ারই হয়ে উঠেছিল তাদের দেখা করার জায়গা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্লেসিয়ারে কাটাতেন দু’জন। জিনাকে পাহাড় চড়ার খুঁটিনাটি শেখাতেন মার্সেল। জিনাও ধীরে ধীরে পাহাড়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।১৯৫০ সালে জিনাকে বিয়ে করেন মার্সেল। আল্পসের এক নির্জন উপত্যকায় পাতা তাঁবুতে হয়েছিল হনিমুন। মার্সেল ও জিনার জীবনে এসেছিল দুই সন্তান। ১৯৫৩ সালে জন্মেছিল প্রথম পুত্র ক্লড, ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় পুত্র ইভেস। ক্লড যখন সাত বছরের ও ইভেস তখন তিন। সেই সময় থেকেই দুই ছেলেকে পাহাড়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন মার্সেল। দুই ভাইয়ের পর্বতারোহণের হাতেখড়ি হয়েছিল আল্পসেই।

পর্বতারোহণের অসামান্য ট্রেনার হিসেবে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন মার্সেল। যুবক যুবতীরা দল বেঁধে আসতেন তার কাছে ট্রেনিং নিতে জন্য। একই সঙ্গে আইস ও রক ক্লাই চাকরি থেকে অবসর নিয়ে মার্সেল ফিরে গিয়েছিলেন পৈত্রিক বাড়িতে। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল মার্সেলের জীবন। ছেলেরাও বাবার মতো হয়ে উঠছিলেন পর্বতারোহী।  মার্সেলের দুই ছেলেই ইউরোপের অসংখ্য পাহাড়ে কয়েক হাজার রুট ওপেন করে ফেলেন।

স্ত্রী জেনিও প্রয়াত হয়েছেন এরই মধ্যে। দুই ছেলেও ঘর সংসার করছেন। ২০০৯ সালে মার্সেলের দুই হাত ও পায়ে অপারেশন করতে হয়েছিল। প্রায় চারমাস বিছানা বন্দী ছিলেন ৮৬ বছরের মার্সেল। সুস্থ হয়েই ফিরে গিয়েছিলেন পাহাড়ে। চলে গিয়েছিলেন ‘রচার ডি নায়ে’ শৃঙ্গ আরোহণ করতে। এই শৃঙ্গের ওপর থেকেই সুইৎজ়ারল্যান্ডের সেরা ভিউ পাওয়া যায়। তবে একমাত্র অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা ছাড়া এই রুটে কেউ যেতে সাহস করেন না। অত্যন্ত কঠিন ‘ফেরাটা’ রুট দিয়ে আরোহণ করেছিলেন ‘রচার ডি নায়ে’। সময় নিয়েছিলেন তিন ঘন্টা। হতাশ হয়েছিলেন মার্সেল, কারণ আগের বছরেই(২০০৮) তিনি এই শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন মাত্র এক ঘন্টায়।

২০১৭ সাল, ৯৪ বছর বয়সি মার্সেল দুই ছেলেকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভডইস আল্পসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কঠিনতম রকফেস ‘মিরর ডি আর্জেন্টাইন’-এ

২০১৭ সাল, ৯৪ বছর বয়সি মার্সেল দুই ছেলেকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভডইস আল্পসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কঠিনতম রকফেস ‘মিরর ডি আর্জেন্টাইন’-এ

২০১৭ সাল, ৯৪ বছর বয়সি মার্সেল দুই ছেলেকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভডইস আল্পসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কঠিনতম রকফেস ‘মিরর ডি আর্জেন্টাইন’-এ। ১৪৭৬ ফুটের এই রকফেস আরোহণকে সর্বোচ্চ শ্রেণির আরোহণ বলে মানেন বিশ্বের প্রথম সারির রক ক্লাইম্বারেরা। তাদের ‘ম্যাড ড্যাড’ ৯৪ বছরে বয়েসে ‘মিরর ডি আর্জেন্টাইন’ আদৌ আরোহণ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে ক্লড ও ইভেসের মনেও সন্দেহ ছিল। মুচকি হেসে মার্সেল ছেলেদের বলেছিলেন, “ভরসা রাখতে পারো।” চুনাপাথরের এই রকফেসে এর আগে প্রায় দু’শো বার ওঠা নামা করেছেন মার্সেল। আজ বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন প্রচুর সেরা রক ক্লাইম্বারের জন্ম দিয়েছিলেন এখানেই।

রক ফেসটির সামনে এসে একবার ওপরের দিকে তাকিয়েছিলেন মার্সেল। তারপর উঠতে শুরু করেছিলেন ধীরে ধীরে। তারই সঙ্গে আরোহণ করছিলেন, ৬৪ বছরের ক্লড ও ৬১ বছরে ইভেস। নির্বিকার মুখে উঠে যাচ্ছিলেন মার্সেল। উত্তেজনায় ঘেমে যাচ্ছিলেন দুই ছেলে ও পাহাড়ের নীচে দাঁড়ানো বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিকেরা। ছোটবেলার মতই এক সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল রকফেস। দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপেছিলেন মার্সেল।

আজ মার্সেলের বয়েস ৯৮ বছর। প্রত্যেক সোমবার টয়োটা গাড়ি চালিয়ে মার্সেল চলে যান লেক জেনেভার পূর্ব তীরে থাকা ভিলেনুভে। সেখানে ভিলেনুভ ক্লাইম্বিং হলে আছে তার নতুন প্রেমিকা। ৫২ ফুট উঁচু একটি ইন্ডোর ক্লাইম্বিং ওয়াল। হলে প্রবেশ করে মার্সেল পায়ে গলিয়ে নেন ক্লাইম্বিং শু। কোমরে বেঁধে নেন হার্নেস। দুই ছেলের একজন থাকেন ওয়ালের নীচে একজন ওপরে।

মার্সেলের এখন একটাই স্বপ্ন, তা হচ্ছে হিমালয় জয় করা

মার্সেলের এখন একটাই স্বপ্ন, তা হচ্ছে হিমালয় জয় করা

কারও দিকে না তাকিয়ে মার্সেল তার পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করেন ওয়ালের ওপর। সব থেকে কঠিন রুটটিই বেছে নেন মার্সেল। তারপর একটি নির্দিষ্ট ছন্দে উঠতে থাকেন ওয়াল বেয়ে। ছেলে ক্লড ও ইভেস জানেন বাবার সাফল্যের গোপন রহস্য হল ‘ছন্দ’। মার্সেল তার ছেলে ও ছাত্রদের চিরকাল বলে এসেছেন পর্বতারোহণ হল অর্কেস্ট্রার মত। একই ছন্দে চলবে চোখ, হাত, পা ও মস্তিষ্ক। একজন সফল পর্বতারোহী হওয়ার এটাই একমাত্র মন্ত্র।

ক্লাইম্বিং ওয়ালের কঠিনতম রুটে উঠতে ও নামতে এক ঘন্টা সময় নেন মার্সেল। নামার পর এক ঘণ্টার বিশ্রাম । এই সময় তার চোখ থাকে ক্লাইম্বিং ওয়ালেই। মার্সেল দেখেন নবীন প্রজন্ম কীভাবে আরোহণ করছে। নবীন প্রজন্মের আরোহণ কৌশল পরের বার কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন আজন্ম শিক্ষার্থী মার্সেল। বিশ্রামের পর আবার ওয়াল বেয়ে উঠতে থাকেন মার্সেল রেমি, নতুন কোনো কঠিন রুট দিয়ে। যে রুটে পোড় খাওয়া স্পোর্টস ক্লাইম্বাররা ছাড়া সচরাচর কেউ যান না। মার্সেলের আরোহণ দেখার জন্য ভিড় করেন ট্যুরিস্টরা। ইন্টারভিউ নিতে আসেন সাংবাদিকেরা। এভাবেই বেলা গড়িয়ে আসে। মার্সেল হিমালয় দিয়েই তার আরোহণ পর্ব শেষ করতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *