ল্যাবে করোনা তৈরি করিয়েছেন বিল গেটসই!

ল্যাবে করোনা তৈরি করিয়েছেন বিল গেটসই!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি স্পেশাল

চীনে ২০১৯ সালে প্রথম ধরা পড়ে করোনা। ১৯ সালের শেষ দিকের কথা সেটি। দেশটির হুবেই প্রদেশের উহান শহরে সে সময় প্রথম করোনার অস্তিত্ব মেলে। এরপর তা ছড়াতে থাকে ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষকে কাবু করতে এই ভাইরাস তৈরি করেছে চীন। কারণ চীন চায় মানুষের মৃত্যু, যার ফায়েদা নেবে বেইজিং। করোনা যখন দেশে দেশে ছড়িয়েছে, তখন চীন বাদে অন্য সব দেশেরই অর্থনীতি কম বেশি ভেঙে পড়ে। মার্কিন অর্থনীতি চলে যায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে। এ অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও জোরালো গলায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতেই চীন এই ভাইরাস উহানের ল্যাবে তৈরি করে ছড়িয়ে দিয়েছে।


সে সব কথা এখন অতীত। বর্তমানে এই ভাইরাসকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই বড় বড় গণমাধ্যমের শিরোনাম মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস; তার নির্দেশে করোনা ছড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন ধনশালী এই ব্যক্তির দিকেই তীর এখন। ‘গোপন ল্যাবে করোনার ভাইরাস তৈরি করেছেন বিল গেটস’ ভারতীয় গণমাধ্যম বিজনেস টুডেতে এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তার বিরুদ্ধে ছড়ানো এই অভিযোগের জবাবও দিয়েছেন। তিনি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যারা এমন তথ্য ছড়াচ্ছেন তারা ‘উন্মাদ’ ও ‘দুষ্ট’ প্রকৃতির মানুষ। সম্প্রতি করোনার ভ্যাকসিনের ফর্মুলা গরীব দেশগুলোর পাওয়া উচিত নয়, এমন মন্তব্য করায়, বিল গেটসকে ডিক্টেটরও বলা হচ্ছে। চলছে জোর সমালোচনা। এই নিন্দার শুরু করোনার আবিষ্কার নিয়েই।

মূলত বিজনেস টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কানাডার ভ্যাংকুভারে টেকনোলজি, এন্টারটেইনমেন্ট, ডিজাইন কনফারেন্সে উপস্থিত হন বিল গেটস। সেই সম্মেলনে থেকে তিনি এক হুঁশিয়ারি বা সতর্ক বার্তা দেন। বলেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে যদি কোনো কিছুর কারণে এক কোটি মানুষ মারা যায়, তাহলে কী হতে পারে, ভাবা যায়! সেটি কোনো যুদ্ধের কারণে নয় বরং সংক্রামক ভাইরাসের কারণে হওয়ার শঙ্কাই বেশি।

সেসময় তার এই কথা দূরদর্শী মনে হয়। কিন্তু খুব একটা পাত্তা পায়নি। সংবাদমাধ্যমে দু’চারটা সংবাদ হয়েছিল এই যা। কিন্তু এখন এটাই উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে যে, এই কথা আগেভাগে কী করে বললেন বিল গেটস? তিনি কী করে জানতেন!

করোনাভাইরাস মহামারির পর তার সেই বক্তব্য সারাবিশ্বে নতুন করে দেখার হিড়িক পড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি দেখা হয়। বেশিরভাগ মানুষের আগ্রহ বিল গেটস কী বলেছেন সেটাতে নয়, কেন তিনি এমনটি বলেছিলেন, সে বিষয়ে।

এরই মধ্যে খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মী পিয়ার্স করবিন, যিনি ব্রিটিশ রাজনীতিক ও লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের বড় ভাই তিনি বলেন, প্রাণঘাতী কোভিড ছড়ানোর পেছনে মার্কিন বিলিয়নিয়ার ও প্রযুক্তি ব্যবসায়ী বিল গেটস ও বিনিয়োগ মোগল খ্যাত জর্জ সরোসের মতো অতি ধনীদের হাত রয়েছে। ভাইরাসটি পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

বাস্তবে বিল গেটসকে নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। অনেকের অভিযোগ, বিল গেটস আসলে বিশ্বের এলিট বা সুবিধাভোগী শ্রেণির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আবার অনেকের বিশ্বাস, বিল গেটস আদতে গরীব মানুষকে পছন্দ করেন না। তিনি ধনী দেশভিত্তিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। পুঁজিবাদী ব্যক্তি। এই রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সাধারণত ফেসবুক গ্রুপে ছড়ানো হয়, এরপর সেগুলো শেয়ার করা হয় লাখ লাখ বার।

বিল গেটসকে নিয়ে যতোরকমের আজগুবি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব চালু আছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এন্টি-ডিসইনফরমেশন বা ভুয়া তথ্য বিরোধী টিম।

এরকম তত্ত্বের মধ্যে একটি হচ্ছে, ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ আফ্রিকা ও ভারতে শিশুদের ওপর টিকা নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছে। এর কারণে সেখানে হাজার হাজার শিশু হয় মারা গেছে, নয়তো অপূরণীয় শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছে।

বিল গেটসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, কেনিয়ায় তিনি এক টিটেনাসের টিকা চালু করেছেন যার মধ্যে আসলে আছে গর্ভপাতের ওষুধ।

ইউনিভার্সিটি অব মায়ামির রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক জোসেফ উসিনস্কি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে বেশ কিছু বই লিখেছেন। তার মতে, বিল গেটস ধনী ও বিখ্যাত বলেই ষড়যন্ত্রকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।

তার মতে, বেশিরভাগ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আসলে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নিয়েই, তাদের বিরুদ্ধে মারাত্মক কোনো কিছুর অভিযোগ আনা হয়‌। বিল গেটসের আগে ছিল জর্জ সোরোস আর রথচাইল্ডস বা রকেফেলারদের নাম।

কারণ গরীব দেশগুলোর জনস্বাস্থ্যের জন্য শত কোটি ডলারের তহবিল জোগাচ্ছেন বিল গেটস। তার বিরুদ্ধে সমালোচনা সাজে না বলেও মনে করেছেন অনেকে।

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তার বিরুদ্ধে ছড়ানো বিভিন্ন অভিযোগের জবাবও দিয়েছেন। তিনি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যারা এমন তথ্য ছড়াচ্ছে তারা ‘উন্মাদ’ ও ‘দুষ্ট ’ প্রকৃতির মানুষ।

করোনার ভ্যাকসিনের ফর্মুলা গরীব দেশের পাওয়া উচিত নয় এমন, মন্তব্য করায়, বিল গেটসকে ডিক্টেটরও বলা হচ্ছে। তার কারণেই মহামারি ছড়িয়েছে। এসব সম্পর্কে অবগত হয়েছেন তিনি।

সার্বিকভাবে এই ধনকুবের বলেন, তথ্যগুলো মোটেই সত্য কিছু নয়। তিনি অবাক হয়েছেন এবং উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষ কি আদৌ এ ধরনের কথা বিশ্বাস করে নাকি এমনিতেই হেয় করার জন্য এটা করছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *