বিখ্যাত ব্যক্তিদের নোটবই

বিখ্যাত ব্যক্তিদের নোটবই

ফিচার

এপ্রিল ১৩, ২০২১ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আমাদেরর মধ্যে অনেকেরই ডায়েরি লেখার অভ্যাস রয়েছে। সারাদিনে কী কী ঘটল, কীভাবে দিন কাটল। কোনো বিশেষ ঘটনা কিংবা কোনো বিশেষ মানুষকে নিয়ে মনের অনুভূতি বন্দি করা একটি পাতায়। দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ এটি অনেকের। তবে বিশেষ মানুষদের সেই নোটবুকগুলো প্রবর্তিতে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে বিশ্বে।

বিজ্ঞানীর নোটবই তার বিজ্ঞানচর্যার অংশ হয়ে ওঠে। আবিষ্কারের আলোয়, প্রকাশিত গবেষণাপত্রে, বক্তৃতায় ধরা পড়ে না এমন অনেক কথা, অনেক ঘটনার সাক্ষী থাকে বিজ্ঞানীর নোটবই, যাকে সেই বিজ্ঞানীর গবেষণার খসড়াও বলা যায়। যেখানে তারা লিখে রাখতেন নানা গবেষণার প্রথম ফলাফল। একান্ত নিজস্ব, সংক্ষিপ্ত ও গোপন। সেখান থেকেই জানা যায়, সোনা তৈরি করতে মেতে উঠেছিলেন আইজ্যাক নিউটন, জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে সব সত্য সামনে আনেননি লুই পাস্তুর। চলুন আজ কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের রাফ খাতার গল্প জানা যাক-

মারি কুরি

মারি কুরির নোটবই দেখতে হলে আপনাকে বিশেষ পোশাক পরে যেতে হবে

মারি কুরির নোটবই দেখতে হলে আপনাকে বিশেষ পোশাক পরে যেতে হবে

মারি কুরির নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। তিনিই প্রথম নারী, যিনি বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তাও দুইবার। এক বার পদার্থবিদ্যায় (১৯০৩) আর এক বার রসায়নে (১৯১১)। ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে তার গবেষণার কাগজপত্র, নোটবই সব কিছুই খুব যত্ন করে সংরক্ষিত আছে। তবে সে সব রাখা আছে সিসার আবরণের ভেতরে, দেখতে হলে আপনাকে বিশেষ ধরনের পোশাক পরে যেতে হবে। কারণ মারি কুরি কাজ করতেন ভয়ানক তেজস্ক্রিয় পদার্থ, রেডিয়াম-২২৬ আর পোলোনিয়াম-২১০ নিয়ে, যাদের তেজস্ক্রিয়তার ফলাফল বিষয়ে তিনি নিজেও কিছুটা অসাবধানই ছিলেন। তাই তার নোটবইয়ে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এখনো অটুট। এই প্রভাব অর্ধেক হতেই সময় লাগবে প্রায় এক হাজার ৬০০ বছর, আর পুরোপুরি শেষ হতে ১১ হাজার বছরেরও বেশি। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের পাহারা ভেদ করে তত দিন এগুলো ধরা-ছোঁয়া যাবে না।

সত্যজিৎ রায় 
পথের পাঁচালী, গুপী গাইন বাঘা বাইন কিংবা চারুলতা বিখ্যাত এসব ছবি যার সৃষ্টি। তাকে চেনেন না এমন মানুষ বাংলার কোথাও পাওয়া যাবে না হয়তো। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত খেরোর খাতার কথা জানেন কি? তার সেই নোটবইয়ে প্রতিটি দৃশ্য, চরিত্রের মেকআপ ও পোশাক-সহ স্কেচ করে রাখতেন তিনি। সেই অনুযায়ী তার ছবির দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রায়িত হত। কারণ এক জন সৃজনশিল্পীও তো বিজ্ঞানীর মতোই আবিষ্কারক।

তার নোটবইয়ে প্রতিটি দৃশ্য, চরিত্রের মেকআপ ও পোশাক-সহ স্কেচ করে রাখতেন

তার নোটবইয়ে প্রতিটি দৃশ্য, চরিত্রের মেকআপ ও পোশাক-সহ স্কেচ করে রাখতেন

বিজ্ঞানীরা তার পরীক্ষার প্রাথমিক ধারণা, যন্ত্রসজ্জা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গণনা ও ফলাফল, লিখে রাখেন নোটবইতে। সব ফলাফল প্রত্যাশিত হয় না, পরীক্ষায় ভুল হয়, সেই সব ব্যর্থতার ফলাফলও পাওয়া যায় রোজকার নোটবইতে। তবে এই লিপিবদ্ধ তথ্য যেহেতু একান্ত নিজস্ব এবং প্রকাশ করার জন্য নয়, তাই সব সময়ই কিছুটা সংক্ষিপ্ত। অনেক সময় নিজের বোঝার মতো করে কিছুটা সাংকেতিক ভাবেও লেখা হয়। সুতরাং, বিজ্ঞানীর নোটবই শুধুমাত্র খসড়া বা রাফ খাতা নয়, ব্যক্তিগত দিনলিপিও নয়। তবে তা বিজ্ঞানীর নিজস্বতার চিহ্ন ধরে রাখে। তাকে বরং গবেষণার অগ্রন্থিত ধারাবিবরণী ভাবা যেতে পারে, যার নির্যাসটুকুই শুধু গবেষণাগারের বাইরে আসে।

লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চি 
লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চি শুধু বিজ্ঞানীই নন, তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রকর, ভাস্কর, স্থপতি ও প্রযুক্তিবিদ। প্রায় ৭ হাজার পাতার নোটবইয়ে তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে তার যাবতীয় ধারণা ও উদ্ভাবনের কথা রেখাচিত্র ও বর্ণনা-সহ ধারাবাহিক ভাবে বিধৃত করেছেন। কিছু নোটবইয়ের আকারেই পাওয়া গিয়েছিল, কিছু বিচ্ছিন্ন পাতাকে গ্রথিত করে ‘কোডেক্স ফরস্টার’ নামে এই নোটবইয়ের সম্ভার এখন ডিজিটাল আকারে ব্রিটিশ গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়। এখানে চোখ রাখলে নদীর প্রবাহ থেকে চাঁদের আলো, অবতল দর্পণের প্রতিফলন থেকে পাখির ডানার গঠন ও উড়ানের রকমফের।

ভিঞ্চি একাধারে চিত্রকর, ভাস্কর, স্থপতি ও প্রযুক্তিবিদ

ভিঞ্চি একাধারে চিত্রকর, ভাস্কর, স্থপতি ও প্রযুক্তিবিদ

এই রকম বহু বিচিত্র বিষয়ে তার বিশ্লেষণ ও তাদের প্রয়োগ (যেমন, আকাশে ওড়ার যন্ত্র, পানির নীচে শ্বাস নেয়ার যন্ত্র ইত্যাদি কী ভাবে তৈরি করা যায়) নিয়ে ভিঞ্চির ভাবনা জানা যাবে। যে হেতু এগুলো প্রকাশ করার কোনও বাসনা তার ছিল না, তাই এই নোটের আনাচে-কানাচে কিছু কিছু ব্যক্তিগত কথাও লেখা থাকতে দেখা যায়। তবে অত্যাশ্চর্য বিষয় হল সমস্ত নোটই ‘আয়না হরফে’ লেখা, অর্থাৎ আয়নার সামনে না ধরে তাকে পড়ার উপায় নেই। সুতরাং নোটবইয়ে যা লেখা আছে, তার সঙ্গে এই অনন্য লিখন পদ্ধতিও এই বিজ্ঞান-অনুসন্ধিৎসু মানুষটির অসাধারণত্বকে তুলে ধরে।

তবে লিয়োনার্দোর নোটবই তার একান্তই ব্যক্তিগত কাজের নথি যা তিনি প্রকাশ করার বা বিচার জন্য কোথাও পাঠাননি, তাই তার নোটবই চরিত্রে অন্যান্য বিজ্ঞানীর তথাকথিত ‘ল্যাবনোটবুক’ থেকে আলাদা। প্রকাশিত গবেষণাপত্র শুধু বিজ্ঞানীর সাফল্যটুকুকে দেখিয়ে দেয়, কিন্তু একজন পেশাদার বিজ্ঞানীর নোটবুকই তার মাঠে নামার আগের নেট প্র্যাকটিস আর ড্রেসিং রুমের গল্প তুলে ধরে। তার নিষ্ঠা, সততা, অধ্যবসায়, দায়বদ্ধতা, এমনকি জীবনদর্শনের পরিচয়ও বহন করে। একটি সফল পরীক্ষা কতগুলো ব্যর্থতা, সংশোধন ও কাটাকুটির উপরে দাঁড়িয়ে থাকে, তার নীরব সাক্ষ্য বহন করে নোটবই। সে দিক থেকে বলা যেতে পারে, বিজ্ঞানীর নোটবই গবেষণার ‘হাইওয়ে’-র সমান্তরাল এক ‘সার্ভিস রোড’-এর মতো, যে রাস্তার খবর খুব কম লোকে জানে।

স্যার আইজ্যাক নিউটন

আধুনিক বিজ্ঞানের জনক নিউটনের নোটবুক

আধুনিক বিজ্ঞানের জনক নিউটনের নোটবুক

আধুনিক বিজ্ঞানের জনক। মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করেন আপেল গাছতলায়। ভূপৃষ্ঠে গতিমান একটি কণা থেকে মহাজাগতিক বস্তু অবধি আমাদের মহাবিশ্বে প্রায় কোনো কিছুই তার প্রতিভার বর্ণালী থেকে বঞ্চিত হয়নি। সারা জীবনে হাজার হাজার পাতা কাজ করেছেন, যার সামান্যই প্রকাশিত। মৃত্যুর পরে তার যাবতীয় কাগজপত্র তার ভাগ্নী ক্যাথরিনের কাছে যায় এবং সেখান থেকে বংশপরম্পরায় নানা হাত ঘুরে ১৮৭২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছায়। নিউটনের সেই অপ্রকাশিত নোটবই শ্রেণিবিভাগ করে ক্যাটালগ তৈরি করতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি সরাসরি বিজ্ঞানবিষয়ক যে সব কাজকর্ম করেছেন, তার চেয়ে হয়তো কিছু বেশিই কাজ করেছেন ধর্মতত্ত্ব (থিয়োলজি) এবং অপরসায়ন (অ্যালকেমি) নিয়ে।

হ্যাঁ, যিনি আমাদের ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস চিনিয়েছেন, প্রিজমের সাহায্যে সাদা আলোকে সাত রঙে ভেঙেছেন, টেলিস্কোপের উন্নতি করেছেন, তার নোটবই বলছে তিনিই সিসা থেকে সোনা তৈরির চেষ্টায় আর ‘শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর’ নিয়ে জীবনের অনেকখানি সময় কাটিয়েছেন। এই পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার হওয়ার পর বিজ্ঞানসমাজ এতই হতাশ হয়েছিল যে, ধর্মতত্ত্ব ও অপরসায়ন নিয়ে তার যাবতীয় কাজ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের হেফাজতে রাখতে পর্যন্ত চায়নি। অনেক টালবাহানার পর ১৯৩৬ সালে নিউটনের নিজের হাতে লেখা সেই সব কাগজপত্র মাত্র ৯ হাজার পাউন্ডে নিলাম হয়ে বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়। তবে পরে তার অনেকটা অংশই উদ্ধার করা গেছে।

স্যার আইজ্যাক নিউটন

স্যার আইজ্যাক নিউটন

জীবিতকালে আইজ্যাক নিউটন তার যে রূপটি মানুষের অগোচরে রেখেছিলেন, তার নোটবই অবশেষে তা প্রকাশ করল। তত দিনে বিজ্ঞানীদের এই অপবিজ্ঞান চর্চাকে অস্পৃশ্য করে না রেখে তাদের একনিষ্ঠ পরিশ্রম (যদিও বিফল), পরীক্ষাপদ্ধতি, তথ্যসংগ্রহ, সাঙ্কেতিক ভাষার ব্যবহার ইত্যাদিকেও এক ধরনের স্বীকৃতি দেয়া শুরু হয়েছে। নিউটনের এই অন্য রকম কাজকর্মের মধ্য থেকেও অনেক আশ্চর্য বিষয় খুঁজে পাওয়া গেল।

যেমন একেবারে সাম্প্রতিক কালে উদ্ধার হয়েছে নিউটনের নিজের হাতে লেখা একটি নোট, যেখানে তিনি অন্য একজনের লেখা থেকে টুকে নিচ্ছেন ‘(ফিলো)সফিক মার্কারি’ তৈরির পদ্ধতি। সফিক মার্কারি হল সেই বস্তু, যা যে কোনো ধাতুকে তার মৌলিক উপাদানে ভেঙে ফেলতে পারে। অতঃপর এই উপাদানগুলো ইচ্ছেমতো জোড়া দিয়ে পছন্দমতো ধাতু (অবশ্যই সোনা) তৈরি করা যাবে। তবে সে জন্য ওই সফিক মার্কারি থেকেই তৈরি করতে হবে পরশপাথর বা ফিলসফার্স স্টোন। সেটা তৈরির জন্য তার নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতি, অর্থাৎ সিসার আকরিকের ঊর্ধ্বপাতনের বর্ণনা আছে ওই কাগজের উল্টো পিঠে।

লুই পাস্তুর

লুই পাস্তুর

লুই পাস্তুর

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হল টিকা। যে কোনও টিকা প্রয়োগের আগে কী কী পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার মোটামুটি একটা ধারণা এখন আমাদের সকলের হয়ে গেছে। লুই পাস্তুরের দু’টি যুগান্তকারী আবিষ্কার হল ভেড়ার অ্যানথ্রাক্স আর মানুষের জলাতঙ্ক রোগের টিকা। পাস্তুরের উদ্যোগে সেই প্রথম এই দুই টিকার প্রতিষেধক প্রয়োগের ফলাফল মুক্তমঞ্চে জনগণের সামনে দেখানো হয়েছিল। প্রথমে অ্যানথ্রাক্সের টিকা (১৮৮১)। দু’দল ভেড়াকে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু ইঞ্জেকশন দেয়া হল। টিকা পেয়েছে এমন ভেড়াগুলো বেঁচে রইল, আর যারা টিকা পায়নি তারা মারা গেল। এক্ষেত্রে পাস্তুর দাবি করেছিলেন যে, তিনি প্রতিষেধকটা তৈরি করেছেন বাতাসে রেখে। সেই পদ্ধতি সমকালীন বিজ্ঞানী চার্লস চেম্বারল্যান্ডের চেয়ে উন্নত, কারণ দ্বিতীয় জন সেটা তৈরি করেছিলেন পটাশিয়াম ডাইক্রোমেটের উপস্থিতিতে। কিন্তু পাস্তুরের নোটবই থেকে জানা যায়, পাস্তুর তখনো পর্যন্ত বাতাসে রেখে টিকাটা তৈরি করতে পারেননি। আসলে উনি চেম্বারল্যান্ডের পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু সে কথা কাউকে জানতে দেননি। কয়েক মাসের মধ্যেই অবশ্য পাস্তুর বাতাসের উপস্থিতিতেই টিকা বানাতে পেরেছিলেন, সে কথাও নোটবইয়ে উল্লেখ করা আছে।

লুই পাস্তুরের লেখা নোটবুক

লুই পাস্তুরের লেখা নোটবুক

জলাতঙ্কের টিকার ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। পাস্তুর দাবি করেছিলেন যে, তাঁর আবিষ্কৃত টিকা কুকুর এবং মানুষ উভয়কেই সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। কথাটা যে মিথ্যে ছিল না, সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে জানি। কারণ, সেই পদ্ধতিই দীর্ঘ দিন অনুসরণ করা হয়েছে কুকুরে কামড়ানোর পর জলাতঙ্ক প্রতিহত করতে। কিন্তু টিকার ‘ট্রায়াল’ এবং কার্যকারিতা বিষয়ে পাস্তুর সর্বসমক্ষে যা দাবি করেছিলেন (৬ জুলাই ১৮৮৫), অর্থাৎ যতগুলো কুকুরের ওপর পরীক্ষা হয়েছে এবং তার যা ফলাফল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছিলেন, তার সব কিছু তখনও পর্যন্ত সত্যি ছিল না। এমনকি জোসেফ মেইস্টার নামে যে আহত ছেলেটিকে প্রথম টিকা দেওয়া হয়েছিল, তার আদৌ সংক্রমণের আশঙ্কা ছিল কি না, তাও স্পষ্ট নয়। সুতরাং যার নামে এখনও প্রতিদিন সকালে আমাদের দুধের পাউচ সংক্রমণমুক্ত করা হয়, মুক্তমঞ্চে তিনি যে জনগণকে কিছুটা বিভ্রান্ত করেছিলেন, এ কথা জানাল তাঁর নোটবই। সে কথা পাস্তুর নিজেও জানতেন খুব ভালো করে, তাই এই পরীক্ষার তথ্য তিনি কোথাও প্রকাশ করেননি। কিন্তু শুধু সকলের আগে থাকার প্রবল উচ্চাশায় তিনি এই প্রতারণাটুকুর আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান

বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকানের লেখা নোটবুকটি

বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকানের লেখা নোটবুকটি

নোটবই কাণ্ডে আর একটি নাম বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান। বিশ্ববিখ্যাত তৈলবিন্দু পতনের পরীক্ষায় তিনি ইলেকট্রনের আধান (১.৬০২২ × ১০-১৯ কুলম্ব) নির্ণয় করেছিলেন। অত্যন্ত জটিল এই পরীক্ষায় সমান্তরাল ধাতব পাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পতনশীল তৈলবিন্দুর গতিবিধির হিসেব রাখতে হয়েছিল। ‘ফিজ়িক্যাল রিভিউ’ জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রে (১৯১৩) মিলিকান টানা দু’মাস ধরে গবেষণা চালিয়ে ৫৮টি তৈলবিন্দুর তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, মোটের ওপর সমস্ত তৈলবিন্দুই একই রকম আচরণ করে। খুব তাড়াতাড়ি তার এই কাজ নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেল (১৯২৩)। মিলিকান মারা যাওয়ারও (১৯৫৩) অনেক দিন পর গেরাল্ড হলটন নামে এক জন পদার্থবিজ্ঞানী মিলিকানের সেই ‘রাফ খাতা’-র সন্ধান পান।

দেখা গেল, ৬০ দিনের ওই দীর্ঘ পরীক্ষায় ওই ৫৮টি বিন্দুর বাইরে আরও অজস্র তৈলবিন্দুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, যারা সবাই মিলিকানের দেয়া ধারণা অনুযায়ী প্রত্যাশিত আচরণ করেনি। তাদের পত্রপাঠ বাদ দেওয়া হয়েছিল। নোটবইয়ে অন্তত ১৪০টি বিন্দুর ফলাফল পাওয়া যায়, যাদের পাশে পাশে মিলিকানের নিজের হাতে ‘দারুণ!’, ‘ঠিক যেমন চাই’, ‘ভুলভাল’, ‘বাদ দাও’, ‘মিলল না’, এই রকম সব মন্তব্য লেখা আছে। অর্থাৎ মিলিকান তার সব তৈলবিন্দুর ডেটা থেকে ৫৮টা ভালো বিন্দুকে নির্বাচন করে সেই তথ্য প্রকাশ করেছিলেন এবং বাকি তথ্য সযত্নে গোপন করেছিলেন। না করলে তিনি তার গবেষণাপত্র ঠিক সময়ে প্রকাশ করতে পারতেন কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। এ ভাবেই প্রখর মেধা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিজ্ঞানীর নোটবইয়ের ‘ব্যক্তিগত বিজ্ঞান’ তার কিছুটা বিড়ম্বিত চেহারা প্রকাশ করে, যার কিছু উদাহরণ এখানে দেখতে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান

বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান

তবে এই সব বিচ্যুতি চাঁদের গায়ে কলঙ্কমাত্র। ইলেকট্রনের আধানও গত একশো বছরে বিশেষ বদলায়নি আর পাস্তুরের নির্দেশিত পদ্ধতিও শুধু জলাতঙ্ক নয়, পরবর্তী কালে অন্য অনেক জীবাণুবাহিত রোগের (যেমন ডিপথেরিয়া, যক্ষ্মা, প্লেগ ইত্যাদি) টিকা তৈরি করতে কাজে লেগেছে। বিজ্ঞানী তার কাজের প্রতি সৎ থাকলে নোটবইয়ে ধরা পড়া সামান্য বিচ্যুতি সারা জীবনের কাজকে বিশেষ প্রভাবিত করতে পারে না। আর বিজ্ঞানী অন্তত তার নোটবইয়ের কাছে সৎ না থাকলে তো এই সব কথা কোনো দিন জানাই যেত না!

হাতে লেখা চিঠি যেমন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তেমনই বিজ্ঞানীদের হাতে লেখা নোটবইও হয়তো ধীরে ধীরে বিরল হয়ে আসছে। এখন সফ্‌ট কপি-র যুগে সবই হয়তো ডক ফাইল বা এক্সেল শিট হিসেবে থাকে, যেখানে কাটাকুটি নেই, হাতের লেখা নেই। তার সুবিধে অনেক, কিন্তু সবচেয়ে বড় সুবিধে হল- সংশোধন সেখানে কোনও চিহ্ন ফেলে রাখে না! এই পদ্ধতির উদাহরণও পাওয়া গেছে হাতে হাতে। গত শতকের শেষের দিকে বেল ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন তরুণ বিজ্ঞানী জাঁ হেনড্রিকসন। কনডেন্সড ম্যাটার, ন্যানোটেক্‌নোলজি-সহ তিন-চারটি বিষয়ে এক সঙ্গে কাজ করতেন।

এরপর গবেষণাপত্র প্রকাশ করতেন ‘নেচার’, ‘সায়েন্স’ ‘ফিজ়িক্যাল রিভিউ’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় জার্নালে। তার পর এক দিন কাজে ও কথায় অমিল ধরা পড়ল, নানা দিক থেকে অভিযোগ পেয়ে হেনড্রিকসনকে তলব করা হল। আত্মপক্ষ সমর্থনে তাকে তার নোটবই (আসল ডেটা) দেখাতে বলা হল। কিন্তু হেনড্রিকসন তো কোনো নোটবই রাখেননি! সব পেপারের ডেটা নাকি শুধু কম্পিউটারেই ছিল, কাজ মিটে যাওয়ার পর হার্ড ডিস্ক খালি করার জন্য সব ‘ডিলিট’ করে দেয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই হেনড্রিকসনের কাজ বা কথা বিশ্বাস করার কোনো উপায় থাকল না, অবিলম্বে তিনি বিজ্ঞান-জগৎ থেকেই বিতাড়িত হলেন। সুকুমার রায় শুনলে নিশ্চয়ই মুচকি হেসে বলতেন, ‘কী করে বলবে বল, তোমরা যে নোটবই লেখোনি!’

Leave a Reply

Your email address will not be published.