বিকিনি কিলার হাস্যজ্জ্বল মুখের পেছনে ৪০ খুন

বিকিনি কিলার: হাস্যজ্জ্বল মুখের পেছনে ৪০ খুন

ফিচার

এখন পর্যন্ত বিশ্ব সাক্ষী হয়েছে বিভিন্ন সিরিয়াল কিলারের নির্মমতায়। তবে সিরিয়াল কিলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় জ্যাক দ্য রিপার। যে কিনা তৎকালীন সময়ে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলের এক আতংকের নাম। বেছে বেছে যৌনকর্মীদের খুন করতেন তিনি। খুবই নৃশংস ছিল তার হত্যার ধরণ। কে ছিল সেই জ্যাক দ্য রিপার,  শত শত বছর কেটে গেলেও তার হদিস মেলে নি আজো। অনেক নিরাপরাধ ব্যক্তি সন্দেহের বশে শাস্তি ভোগ করেছেন।

তবে সে যাই হোক, পরবর্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক সিরিয়াল কিলারের নাম পাওয়া গেছে। সবচেয়ে কনিষ্ঠ সিরিয়াল কিলারের বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। শুধু শিশুদেরই হত্যা করেছে সে। তিনটি খুনের সব গুলোই ছিল শিশু। দুটি তার নিজের বোন আর বাকিজন ছিল পাশের বাড়ির এক শিশু। আচ্ছা যাই হোক সিরিয়াল কিলার দেখতে আলাদা কিছু নয়। সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হওয়ায় মিশে থাকে জনতার ভিড়ে।

থাইল্যান্ডে ঘুরতে আসা নারীদের জন্য ত্রাস ছিলেন শোভরাজ

থাইল্যান্ডে ঘুরতে আসা নারীদের জন্য ত্রাস ছিলেন শোভরাজ

১৯ শতকের প্রায় শেষের দিকে ৭৫ সাল। সবে আমদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে ঘটে যাচ্ছে একের পর এক খুন। সবই নারীদের। বিশেষ এক কায়দায় খুন করা হচ্ছে এই নারীদের। প্রথমে মাদক সেবন এরপর জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। লাশ পাওয়া যাচ্ছে সমুদ্র পাহাড়সহ বিভিন্ন পর্যটন জায়গাগুলোতে। তবে খুনীর একটি সাইন ছিল লাশগুলোর সঙ্গে। সেটা হচ্ছে সব নারীর পরনে ছিল শুধু বিকিনি। যে নারীরা বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছেন তারা কিন্তু স্থানীয় নয়। সবাই পাশ্চাত্য থেকে আসা পর্যটক।

অনেক সিরিয়াল কিলারের মতোই এই খুনীও ধরা পড়েছিল। তবে পালিয়ে গেছে জেল থেকে। নাম ছিল গুরমুখ ভাবনানি শোভরাজ, ওরফে চার্লস শোভরাজ। স্কুলজীবন থেকেই বন্ধুমহলে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। অভিনয় ছিল তার সহজাত ক্ষমতা। চার্লি চ্যাপলিনের হুবহু নকল করে মুগ্ধ করে রাখতেন বান্ধবীদের। তার সেই কারণেই জুটেছিল ‘চার্লস’ ডাকনাম। কিন্তু তখন কে-ই বা জানত, একদিন এই নামের ওপরেই গড়ে উঠবে কুখ্যাতির পাহাড়?

ছোট থেকেই নারীদের মুগ্ধ করার কৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি

ছোট থেকেই নারীদের মুগ্ধ করার কৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি

শোভরাজের জন্ম ১৯৪৪ সালের ৬ এপ্রিল, ভিয়েতনামের সাবেক সাইগনে। এখন এর নাম হো চি মিন সিটি। তার বাবা শোভরাজ হাতচন্দ ভাওনানি ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। মা, ত্রান লোয়াং ফুন ছিলেন ভিয়েতনামের নাগরিক। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ দেখেছিলেন শোভরাজ। তার মা নতুন সংসার বেঁধেছিলেন ফরাসি প্রেমিকের সঙ্গে। ফরাসি সেনাবাহিনীর সেই লেফটেন্যান্ট দত্তকও নিয়েছিলেন শোভরাজকে। কিন্তু নতুন পরিবারে মানিয়ে নিতে পারেনি শোভরাজ। তার মায়ের পরে আরও সন্তান হয়। এর পরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে পড়ে শোভরাজ।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় হবে সেটা। ১৯৭৫ সাল। আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল থাইল্যান্ড। স্রেফ বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছিল পাশ্চাত্য থেকে আসা একের পর এক পর্যটক। বিশেষত মহিলারাই। কিছুদিন পর সমুদ্রের ধার থেকে উদ্ধার হত তাদের ঝলসে যাওয়া দেহ। পরনে বিকিনি। টাকা পয়সা, মূল্যবান অলঙ্কারের সঙ্গে ‘মিসিং’লিস্টে থাকত তাদের পাসপোর্ট। প্রতি ক্ষেত্রেই সাদৃশ্য থাকত ফরেন্সিক রিপোর্টে। প্রথমে মাদক প্রয়োগ, তারপর জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা। খুনের এমন অদ্ভুত ধরনের জন্যই ঘাতক পরিচিত হন ‘বিকিনি কিলার’ নামে। কিন্তু এই মুখোশের আড়ালে কে লুকিয়ে রয়েছে, তার সন্ধান মেলেনি তখনও।

নারীদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করতেন শোভরাজ

নারীদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করতেন শোভরাজ

বছর খানেক পর একইভাবে তার শিকার হলেন থাইল্যান্ডে ঘুরতে আসা এক ওলন্দাজ দম্পতি। উঠেছিলেন হল্যান্ডেরই দূতাবাসে। কাজেই নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। তদন্তের দায়িত্ব নিলেন ওলন্দাজ কূটনীতিবিদ হার্মান ক্লিপেনবার্গ। অবশেষে জানা গেল ঘাতকের পরিচয়। চার্লস শোভরাজ। শুধু সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বছর দুয়েকের মধ্যেই চল্লিশের বেশি খুন করেছেন তিনি। সবগুলোই থাইল্যান্ডে। তবে তার শিকারের মানচিত্র শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, নেপাল, ফ্রান্স, গ্রিস, আফগানিস্তান-সহ একাধিক দেশেই অপরাধের জাল বুনেছেন তিনি।

চার্লস শোভরাজের এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তার খুনের মোটিভ। এই ব্যাপারটাই আর পাঁচটা সিরিয়াল কিলারের থেকে আলাদা করে দিয়েছে শোভরাজকে। সাধারণত সিরিয়াল কিলারদের করা ধারাবাহিক খুনের পিছনে থাকে কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। চার্লসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একাবারেই তেমন ছিল না। বরং অর্থ-প্রতিপত্তি-মূল্যবান রত্নের জন্যই বারবার রক্তে হাত ধুয়েছেন তিনি। আর পাসপোর্ট চুরি? তা নকল করে এক দেশ থেকে অন্যত্র পালানোর জন্য।

পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর জেল ভেঙে পালিয়েছেনও কয়েকবার

পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর জেল ভেঙে পালিয়েছেনও কয়েকবার

শোভরাজের প্রাথমিক হাতিয়ার এই সব কারণ হলেও ধীরে ধীরে তার কারণ বদলে যেতে থাকে। শিকারের ওপর মানসিক প্রভাব বিস্তার। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা। শিকারদের কিন্তু জোর করে অপহরণ করতেন না তিনি। বরং নিজের ইচ্ছাতেই তারা শোভরাজের সঙ্গে সামিল হতেন। তারপরই ঘটত হত্যালীলা। তাই খুনির থেকেও ‘ম্যানিপুলেটার’ কথাটাই হয়তো বেশি প্রযোজ্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই সিরিয়াল কিলারের জন্য।

জড়িয়ে পড়ে ছোটখাটো অপরাধে। ১৯ বছর বয়সেই প্যারিসে ডাকাতির ঘটনায় প্রথম বার কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাকর্তারা মুগ্ধ ছিলেন তার আচার আচরণে। নিজের সেলে বই রাখার বিশেষ অনুমতি পেয়েছিল সে। কারাবন্দি থাকার সময়ে আলাপ হয় এক ধনী স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে। প্যারোল থাকার সময় তার সুবাদে শোভরাজ পরিচিত হয় প্যারিসের উপর মহলের সঙ্গে।

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে শোভরাজ

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে শোভরাজ

শোভরাজের ব্যক্তিগত জীবনেও স্পষ্ট এই ব্যাপারটা। সহজেই নারীদের মুগ্ধ করার একটা প্রতিভা তার ছোট থেকেই ছিল। শোভরাজের এই প্রতিভাই কাজে লেগেছিল এই ক্ষেত্রে। তার প্রথম শিকার ছিল তার নিজের স্ত্রী শানতাল। রক্ষণশীল অভিজাত ফরাসি পরিবারের কন্যা তিনি। প্রথম ভালোবাসা, তারপর দেশ ছেড়ে পলায়ন। তবে শোভরাজের সংস্পর্শ হুবহু পাল্টে দিল শানতালের চরিত্র। শুরুতে যে শানতাল আতঙ্কিত থাকতেন প্রেমিকের এই অন্ধকার জগত নিয়ে, সেই শানতালই একটা সময় হয়ে উঠলেন অন্যতম তার সহকর্মী।

২০০৮ সাল। নেপালে কারাবন্দি শোভরাজ। আর জেলে থেকেই দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন তিনি ৪৩ বছরের ছোট নিহিতা বিশ্বাসকে। বাবা বাঙালি হলেও, নিহিতা নেপালের নাগরিক। নিহিতা তখন আইনের ছাত্রী। শোভরাজের আইনজীবীর হয়ে দোভাষীর কাজ করতেই তিনি হাজির হয়েছিলেন কারাগারে। প্রথম দেখাতেই প্রেম। তার কয়েক মাসের মধ্যেই বিবাহ। তবে শোভরাজের সঙ্গে পরিচয়ের পরে তার মধ্যেও দেখা গিয়েছিল এক অদ্ভুত বদল।

দ্বিতীয় স্ত্রী  নিহিতাকে কারাগারেই বিয়ে করেন

দ্বিতীয় স্ত্রী নিহিতাকে কারাগারেই বিয়ে করেন

খুনের সব তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নিহিতা দাবি করেছিল, সম্পূর্ণ নিষ্পাপ শোভরাজ। কারাবন্দি চার্লসের সঙ্গে দেখা করতে প্রায়শই তিনি হাজির হতেন কারাগারে। পৌঁছে দিতেন বিলাসবহুল পানীয়। জেল থেকে মুক্তির পর নতুন সংসার গড়ার পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন শোভরাজ। তবে আসলেই কি তাই? নাকি শুধু কারাবন্দি অবস্থায় কিছু সুবিধা পাওয়ার জন্যই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি নিহিতার ওপরে। এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে অনেক।

প্রথম জীবনে ফ্রান্সে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ার পর শোভরাজ বিস্তারে পড়াশোনা করেছিলেন মনস্তত্ত্ব এবং আইন নিয়ে। সেই শিক্ষা যে পদে পদে কাজে লাগিয়েছেন তিনি, তাতে সন্দেহ নেই বিন্দুমাত্র। অপরাধ জগতে খুনের পাশাপাশি শোভরাজের খ্যাতি কারাগার ভাঙার দক্ষতার জন্যেও। ভারতের দুর্ভেদ্যতম কারাগার তিহার জেল থেকে পলায়নই হোক কিংবা বন্দি অবস্থায় দিল্লির হাসপাতাল থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা- প্রতিক্ষেত্রেই রয়েছে সেই সম্মোহনী প্রতিভা। গারদ ভাঙার আগে, তিহারের সব কয়েদি এবং জেলারদের নিয়ে দু’বার পিকনিকের আয়োজন করেছিলেন তিনি। তারপর তৃতীয় পিকনিকে মাদক মেশানো হল কাস্টার্ডে। প্রথম দুটি ঘটনা শুধু পুলিশ প্রশাসনের বিশ্বাস অর্জনের জন্য সাজানো দাবার চাল।

শেষমেশ একাই ধরা দেন পুলিশের কাছে, এখনো আছেন কারাগারে

শেষমেশ একাই ধরা দেন পুলিশের কাছে, এখনো আছেন কারাগারে

তিহার থেকে পালানোর পর শোভরাজ আবার ধরা পড়েন। তবে তাতে পুলিশের কৃতিত্ব কতটা ছিল, সন্দেহ আছে সে বিষয়ে। কৌশল করেই ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি ধরা দিয়েছিলেন- সেই সম্ভাবনাই প্রকট। তা যদি না-ই হয়, তবে প্রকাশ্যে ট্যাক্সি থেকে নেমে বিলাসবহুল হোটেলে কেন ডিনার করতে যাবেন তিনি? যখন কিনা তার নামে সারাদেশে জারি রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। সর্বত্র জাল বিছিয়ে রেখেছে পুলিশ।

একটু ভেবে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টা। আসলে শোভরাজের প্রয়োজন ছিল খানিকটা সময় কিনে নেয়ার। কেননা ১৯৯৫ সালে থাইল্যান্ড মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল শোভরাজকে। সে দেশে পৌঁছলে এক প্রকার নিশ্চিত ছিল মৃত্যু। তবে থাইল্যান্ডের আইন বলছে, রায়ের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২০ বছর। তার মধ্যে যদি অপরাধী ধরা না পড়ে, তবে বাতিল হবে সেই আদেশ। ফলত, ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি ধরা দেন ভারতীয় পুলিশের কাছে। অর্থাৎ শাস্তির তুল্যমূল্য বিচার করেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন কারাগারকে।

এই সিরিয়াল কিলারকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানান ডকুমেন্টরি এবং সিরিজ

এই সিরিয়াল কিলারকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানান ডকুমেন্টরি এবং সিরিজ

বর্তমানে নেপালে কারাবন্দি শোভরাজ। বিগত ১৬ বছর ধরেই তিনি রয়েছেন সেখানে। তবে এর মধ্যে একবারও জেল ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেননি তিনি। ২০০৪ সালে ফ্রান্সের গোপন ডেরা থেকে কেনই বা এসে তিনি ধরা দিয়েছিলেন নেপালে, সঠিক কারণ জানা নেই তারও। হতে পারে এও তার কোনো মাস্টার-স্ট্রোক। আজ থেকে কয়েক বছর পর হয়তো জানা যাবে সেই কারণ। হয়তোবা  প্রকাশ্যে আসবে না তা কোনোদিনই। নেটফ্লিক্সে বিকিনি কিলার নামে শোভরাজকে নিয়ে একটি সিরিজ তৈরি করা হয়। এছাড়াও অনেক ডকুমেন্টরি তৈরি হয়েছে এই রহস্যময় বিকিনি কিলারকে নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *