টাকা দিয়ে কয়েদির মতো জীবন কাটানোর সুযোগ পাবেন এই জেলে

টাকা দিয়ে কয়েদির মতো জীবন কাটানোর সুযোগ পাবেন এই জেলে

ফিচার স্পেশাল

জুন ৫, ২০২১

জেলখানা বা কারাগার সংশোধানাগার হলেও অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার জন্যই এর উৎপত্তি হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকেই কয়েদিদের আটকে রাখার জন্য জেলখানা ব্যবহৃত হতো। কত রকমের কয়েদির বসবাস এই অন্ধকার চার দেয়ালের মধ্যে। জেল জীবন কেমন হয় সাধারণ মানুষের এই নিয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেক। আপনারও জানতে ইচ্ছা করলে একটি দিন কাটিয়ে আসতে পারেন জেলের চার দেয়ালের মধ্যে।

ভাবছেন হয়তো ভুলভাল কিছু বলছি। না একেবারেই না, এমনই ব্যবস্থা করেছে সাঙ্গারেডি হেরিটেজ জেল মিউজিয়াম। তেলেঙ্গানা রাজ্যে অবস্থিত এই কারাগারটি। ১৭৯৬ সালে গোলকুণ্ডা দুর্গের আদলে এই কারাগারটিকে তৈরি করেছিলেন হায়দরাবাদ স্টেটের নিজাম ‘ প্রথম সালার জং ‘ । এই কারাগারটি ২০১২ সাল পর্যন্ত তেলেঙ্গানা কারা দফতরের অধীনে সক্রিয় ছিল। জেলের দশটি ব্যারাকে ৯০ জন পুরুষ ও ৫ জন নারীলা বন্দির থাকার ব্যবস্থা ছিল তখন। তবে কান্ডিতে নতুন জেলা কারাগার তৈরি হওয়ায়, সেখানে এই জেলের সকল বন্দিকে স্থানান্তরিত করা হয়। সাঙ্গারেড্ডি কারাগারটি হয়ে গিয়েছিল কয়েদি শূন্য। কিন্তু জেলটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নষ্ট করতে চায়নি রাজ্যের কারা দফতর। ২০১৬ সালে সাঙ্গারেডিড জেলটিকে একটি মিউজিয়ামের রূপ দেয়া হয়। একাজে কারা দফতরকে সাহায্য করেছিল ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ললিতকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা।

১৭৯৬ সালে গোলকুণ্ডা দুর্গের আদলে এই কারাগারটিকে তৈরি করেছিলেন হায়দরাবাদ স্টেটের নিজাম ‘ প্রথম সালার জং `

১৭৯৬ সালে গোলকুণ্ডা দুর্গের আদলে এই কারাগারটিকে তৈরি করেছিলেন হায়দরাবাদ স্টেটের নিজাম ‘ প্রথম সালার জং’

ছাত্রছাত্রীরা রং – তুলি ও ভাস্কর্যের সাহায্যে ব্যারাকের বিভিন্ন ঘরে তুলে ধরেছিল অপরাধ ও শাস্তির অজানা ইতিহাস। যার বিস্তার ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত। এই মিউজিয়াম থেকে আপনি জানতে পারবেন প্রাচীন ভারতে শাস্তির ভয়াবহতা। কীভাবে শূলে চড়িয়ে, ফুটন্ত জলে ডুবিয়ে বা হাতির পায়ের তলায় থেঁতলে মারা হত অপরাধীদের সমকামিতা ও প্রাক-বিবাহ যৌনতার জন্যেও পেতে হত ভয়াবহ সব শাস্তি। কীভাবে ব্রিটিশদের নৃশংসতা ও বর্বরতার সাক্ষী হয়ে উঠেছিল এই সাঙ্গারেড্ডি জেল, জানবেন তাও।

সাঙ্গারেডিড জেলে মিউজিয়াম তৈরি করার সময় কারা দফতরের তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল ভি কে সিং-এর মনে এসেছিল অসামান্য একটি ভাবনা। তিনি চেয়েছিলেন মিউজিয়াম দেখতে আসা দর্শকদের একদিনের জন্য আসল কারাবাসের অভিজ্ঞতা দিতে। আসল জেল ও কারাবাস কী, সেটা প্রত্যেকের জানা উচিত। তাহলে হয়ত অপরাধের হার কমলেও কমতে পারে। শোনা যায় চীনেও নাকি নিয়মিত জেলে নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি অফিসার ও ব্যবসায়ীদের। তারা জেলে গিয়ে জেলবন্দি অফিসার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। নিজের চোখে দেখেন বন্দি অফিসার ও ব্যবসায়ীদের দুর্দশা। এতেও নাকি কমে অপরাধের হার।

জেলের ভেতরের একেক মিনিট মনে হবে একেক যুগ সমান

জেলের ভেতরের একেক মিনিট মনে হবে একেক যুগ সমান

ডিরেক্টর জেনারেলের ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়েছিল তেলেঙ্গানা রাজ্যের কারা দফতর। সাঙ্গারেড়ি জেলের নারী ব্যারাকের সেলটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল পর্যটকদের বন্দি রাখার জন্য। জেলের কড়া অনুশাসনের মেনে জেলবন্দি হিসেবে চব্বিশ ঘন্টা কাটাতে পারবেন যে কেউ। তবে তার বিনিময়ে দিতে হবে পাঁচশো টাকা। তবে কেউ যদি চব্বিশ ঘন্টার হওয়ার আগেই জেলমুক্ত হতে চান, তাকে জরিমানা হিসেবে দিতে হবে আরও পাঁচশো টাকা। এই কর্মসূচীটির নাম দেয়া হয় ‘ফিল দ্য জেল ’। সাঙ্গারেভিড় জেলই ভারতের প্রথম জেল হিসেবে এই উদ্যোগ নিয়েছিল। পরবর্তীকালে দিল্লির তিহার ও মহারাষ্ট্রের ইয়েরওয়াড়া জেলও এই ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

২৪ ঘন্টা টাকার বিনিময়ে এই জেলে কয়েদির মতো জীবন যাপন করতে পারবেন

২৪ ঘন্টা টাকার বিনিময়ে এই জেলে কয়েদির মতো জীবন যাপন করতে পারবেন

চাইলে যে কেউ গিয়ে এখানে থাকতে পারবেন। তবে চলুন জেনে নেয়া যাক কীভাবে এখানে থাকবেন। কী খাবেন, কী করবেন। সেখানকার সব খুটিনাটি। প্রথমে কাউন্টার থেকে স্লিপটি নিয়ে জেলের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়ালেই, লোহার ফটকের মধ্যে লাগানো ছোট দরজাটা খুলে যাবে। মাথা নিচু করে আপনাকে ঢুকতে হবে জেলের মধ্যে। ঢোকামাত্রই একটি শক্ত হাত ধরে নেবে আপনার হাত। সে হাতে সামান্যতম সহানুভূতির ছোঁয়া নেই। ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ অফিসার আপনাকে নিয়ে যাবেন একটা লম্বা ঘরে। ঘরটি হল জেলের লকার কাম স্টোররুম।

আপনাকে সেখানে জমা দিতে হবে আপনার কাছে থাকা যাবতীয় জিনিসপত্র এমনকি মোবাইলও। আপনি যা জমা দিলেন, তার একটি তালিকা তৈরি করে খালি একটি লকারে রেখে দেবেন কর্মীরা। এরপর তারা আপনার হাতে তুলে দেবেন কিছু জিনিসপত্র। যা জেলের আইন অনুযায়ী সব নতুন কয়েদিদের দেয়া হয়ে থাকে। আপনি পাবেন স্টিলের প্লেট, কাপ, গ্লাস, বাসন ধোয়ার সাবান, দুটি চাদর, একটি পানির বোতল, কয়েদির উর্দি। সাদা রঙের খাদির উর্দিগুলো বানান এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলের কয়েদিরা। উর্দি পরার পর আর এক প্রস্থ তল্লাসি চালানো করা হবে আপনার শরীরে। এরপর আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে আপনার সেলে। আপনার পাশাপাশি হাঁটবেন এক গম্ভীর পুলিশ অফিসার। আপনি সামান্য হাসার চেষ্টা করলেও উনি সাড়া দেবেন না। কারণ আপনি কয়েদি। আপনার সঙ্গে কিছু দূরত্ব তাঁকে রাখতেই হবে। এটাই জেলের আইন।

জেলে ঢোকার পর আপনার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র জমা দিয়ে কয়েদিদের জন্য বরাদ্দ জিনিসপত্রগুলো আপনাকে দেয়া হবে

জেলে ঢোকার পর আপনার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র জমা দিয়ে কয়েদিদের জন্য বরাদ্দ জিনিসপত্রগুলো আপনাকে দেয়া হবে

মিনিট তিনেকের মধ্যেই আপনি চলে আসবেন উঁচু পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ির সামনে। আয়তক্ষেত্রাকার এক কামরার এই বাড়িটিতেই বন্দি থাকতে হবে আপনাকে। বন্দি থাকতে হবে পুরো চব্বিশ ঘণ্টা। আপনি অবশ্য এর মধ্যেই এক ঘণ্টা কাটিয়ে ফেলেছেন। কারাকক্ষের গ্রিলের দরজা খুলে দেবেন কারাকর্তা। সেলের ভেতরে যাওয়ার আগে আপনাকে বাইরের ট্যাপল থেকে এক বোতল খাওয়ার পানি নিতে হবে। থালা বাটি গ্লাস ধুয়ে রেখে দিতে হবে সেলের বাইরে। তারপর আপনাকে সেলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। সশব্দে বন্ধ হয়ে যাবে সেলের দরজা। হুড়কো লাগানোর পর, দরজায় লাগিয়ে দেয়া হবে শতাব্দী প্রাচীন ভারী তালা।

প্রায় কুড়ি ফুট লম্বা ঘরটির দেয়ালে চুনকামের ভ্যাপসা গন্ধ। গ্রিলের দরজা ছাড়া দুটো জানলা দিয়েও আলো ঢুকছে ঘরে। ঘরের বাম দিকে ফুট তিনেক উঁচু একটা পাঁচিল। পাঁচিলের পিছনে আছে ইন্ডিয়ান স্টাইলের টয়লেট। যেটায় বসলে আপনার শরীরের ওপরের অংশ দেখা যাবে। তবে টয়লেটটি পরিষ্কার। আসলে আপনার মত যারা বন্দি থাকেন, নিজেদের তাড়নাতেই তার টয়লেটটি পরিষ্কার রাখেন। নাহলে দুর্গন্ধে ঘরে টেকা যাবে না টয়লেটের পাশেই চৌবাচ্ছা। ডানদিকের দেয়ালে আছে টিউবলাইট। ছাদ থেকে ঝুলছে একটি সিলিং ফ্যান। কিন্তু টিউবলাইট জ্বালানো ও ফ্যান চালানোর অধিকার আপনার নেই। এই দুটি নিয়ন্ত্রিত হয় সেলের বাইরে থেকে। কারণ আপনি কয়েদি। আপনার ইচ্ছামতো জেল চলবে না। আপনাকে এই চব্বিশ ঘণ্টা চলতে হবে জেলের আইন ও রুটিন মেনে।

উঁচু পাচিল ঘেরা এই জেল হবে আপনার সেই সময়গুলোর সাক্ষী

উঁচু পাচিল ঘেরা এই জেল হবে আপনার সেই সময়গুলোর সাক্ষী

এরপর আপনি মাটিতে পেতে নেবেন একটি শতরঞ্চি। অন্যটি মাথার বালিশ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে আপনাকে। পানির বোতলটা বিছানার পাশে রেখে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়বেন। বিস্ময়ের ঘোর আপনার তখনও কাটবে না। হতভম্ভ হয়ে ভাবতে থাকবেন, এটাই তাহলে জেল! এভাবেই তাহলে সেলে ঢোকে কয়েদিরা! আপনাকে মেনে নিতে হবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার জন্য আপনি একজন সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত কয়েদি। আপনি এখন আছেন ২২৫ বছরের পুরেনো এক কারাগারে। আপনি একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলেন, আপনার সম্বিত ফিরিয়ে দেবে সেলের তালা খোলার আওয়াজ। সকাল সাড় দশটা বাজলেই সেলের মেঝেতে নামিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে আপনার দুপুরের খাবার। দুটি চাপাটি, সামান্য ভাত, অড়হড়ের ডাল ও রসম। একই থালায় সবার জন্য খাবার দেয়া। এখানেও মোটামুটি যুদ্ধ করে নিজের ভাগের খাবারটুকু খেতে হবে আপনাকে।

এই জেলে কয়েদিদের খাবার দেয়া হয় জেলের রুটিন মেনে। সকাল ৬ টা থেকে ৬-৩০ টার মধ্যে চা ও বিস্কুট। সকাল ৭ থেকে ৭.৩০ এর মধ্যে প্রাতরাশ। প্রাতরাশে থাকে চাপাটি ও ডাল। সকাল সাড়ে দশটায় দেয়া হয় দুপুরের খাবার  বেলা সাড়ে বারোটার সময় আর একবার চা। বিকেল ৪.৩০ থেকে ৫ টার মধ্যে দিয়ে দেয়া হয় রাতের খাবার। রাতের মেনু ও একই। তবে একটি তরকারি ও দই থাকে সঙ্গে। কোনো খাবারই এই জেলে রান্না করা হয় না। রান্না করেন কান্ডির জেলের কয়েদিরা। সেই খাবার আনা হয় এই জেলে থাকা কর্মী ও শখের কয়েদিদের জন্য। দুপুরের খাবার খেয়ে নিজের প্লেট ধুয়ে রাখতে হবে আপনাকেই । সেই বাসন গ্রিলের নিচ দিয়ে সেলের বাইরে বের করে দিতে হবে। তাতেই আসবে রাতের খাবার। বাসন অপরিষ্কার থাকলে ওই থালাতেই খেতে হবে আপনাকে।

সময়মতো খাওয়া, ঘুম ছাড়া বাইরের জগতের কোনো কাজ আপনার জন্য নেই এখানে

সময়মতো খাওয়া, ঘুম ছাড়া বাইরের জগতের কোনো কাজ আপনার জন্য নেই এখানে

কোনো এফআইআর, গ্রেফতারি পরওয়ানা ও আদালতের রায় ছাড়াই আপনি জেলবন্দি। ব্যাপারটা প্রথম প্রথম আপনাকে আনন্দ দিলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে গ্রাস করতে থাকবে একরাশ বিরক্তি ও অসহায়তা। সময় কাটতে চাইবে না। এক মিনিটকে মনে হবে এক ঘণ্টা। সব থেকে বেশি কষ্ট দেবে মোবাইল ও টিভি। চব্বিশ ঘন্টার জন্য বন্ধ সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বোলানো, ঘন ঘন হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ চেক করা, টিভি দেখা ও ইউটিউব সার্চিং করা। আপনার নিজেকে মনে হবে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা কোনো নিঃসঙ্গ দ্বীপের নিঃসঙ্গ বাসিন্দা। সভ্যতা থেকে অনেক দূরে থাকা আদিম কোনো মানুষ।

ক্রমশ বিষন্নতা গ্রাস করবে আপনাকে। তাই তিরিশ শতাংশ পর্যটক এই সেলে তিন চার ঘন্টার বেশি বন্দি থাকতে পারেন না। ৫০০ টাকা জরিমানা দিয়ে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে দ্রুতপদে জেল ছাড়েন তারা। দুপুর সাড়ে বারোটার সময় সেলের গরাদে ঠং ঠং আওয়াজ শুনতে পাবেন। কেটলি করে চা নিয়ে এসেছেন কারাকর্মী। গরাদের ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে দিন কাপ। কেটলি থেকে কাপে ঝরে পড়বে চা নামের গরম পানি, যার রং বর্ষার নদীর মতোই ঘোলাটে। বিকেল তিনটায় আবার খুলে যাবে সেলের গেট। আপনি সশ্রম কারাদণ্ডের আসামী। তাই জেলের নিয়ম মেনেই আপনাকে কাজ করতে যেতে হবে। তিন চার ঘন্টা সেলে বন্দি থাকার পর খোলা আকাশের নীচে আসতে পেরে আপনার মন আনন্দে নেচে উঠবে। আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে জেলের বাগানে। সেখানে আপনাকে শেখানো হবে আগাছা পরিষ্কার করা, চারাগাছ লাগানো ও চারাগাছের পরিচর্যা করার বিভিন্ন পদ্ধতি। তারপর সেগুলো হাতে কলমে করে দেখাতে হবে। কাজে ফাঁকি মারলেই ধমক খেতে হবে। তর্ক করলে রাতের খাবারে রুটি কম মিলতে পারে।

সাঙ্গারেডিড জেলে থাকা ঐতিহাসিক লন্ডন বেলের আওয়াজ পরিবেশকে করে তুলবে আরও ভয়াবহ

সাঙ্গারেডিড জেলে থাকা ঐতিহাসিক লন্ডন বেলের আওয়াজ পরিবেশকে করে তুলবে আরও ভয়াবহ

সাড়ে চারটের মধ্যেই আপনাকে ফিরিয়ে আনা হবে সেলে। একই সঙ্গে সেলে ঢুকিয়ে দেয়া হবে রাতের খাবার। বিকেল পাঁচটায় ডিনার করা অভ্যাস আপনার না থাকলেও এখানে এটাই নিয়ম। এখন না খেলে পরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া খাবার আপনাকেই খেতে হবে। না খেলে উপোসের অপশন তো আছেই। কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করতেও আসবে না। কেননা এটা আপনার বাড়ি বা হোটেল নয়। জানলা দিয়ে সেলের দেয়ালে পড়ছে অস্তমিত সূর্যের শেষ রশ্মিটি। মিশকালো অন্ধকারে আবার আপনাকে ঘিরে ধরবে একাকীত্বের বিষন্নতা। জেলের কোলাহলহীন পরিবেশকেও ভীষণ নির্মম বলে মনে হবে আপনার। ইতিমধ্যে প্রদীপের উজ্জলতা নিয়ে জ্বলে উঠেছে সেলের টিউব লাইট। অসীম ক্লান্তি নিয়ে ঘুরতে শুরু করেছে পাখা। মর্মে মর্মে আপনি অনুভব করতে থাকবেন কারাবাসের যন্ত্রণা।

রাতে শক্ত মেঝেতে ঘুমাবার চেষ্টা করেও ঘুম হবে না। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসবে ভারী বুটের আওয়াজ। সাঙ্গারেডিড জেলে থাকা ঐতিহাসিক লন্ডন বেলের আওয়াজ পরিবেশকে করে তুলবে আরও ভয়াবহ  কখনো নিজেকে মনে হবে আন্দামানের সেলুলার জেলে দশকের পর দশক বন্দি থাকা বিপ্লবী। কখনো মনে হবে নির্জন ডেথ সেলে থাকা ফাঁসির আসামি। সারাদিনের ক্লান্তি, উত্তেজনা ও ভয় মিলেমিশে একসময় আপনার চোখে ঘুম এনে দেবে। ঘুম ভাঙিয়ে দেবে লন্ডন বেল। বুঝতে পারবেন এখন ভোর পাঁচটা। সূর্যের আলো এখনও আকাশ ভরাতে পারেনি। কিন্তু আপনার জন্য এনে দিয়েছে আপনার জীবনের এক অসামান্য পারে। দ্রুত উঠে সেলের টয়লেটে প্রাকৃতিক কাজ সেরে নিতে হবে আপনাকে।

ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ললিতকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা রং - তুলি ও ভাস্কর্যের সাহায্যে ব্যারাকের বিভিন্ন ঘরে তুলে ধরেছিল অপরাধ ও শাস্তির অজানা ইতিহাস

ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ললিতকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা রং – তুলি ও ভাস্কর্যের সাহায্যে ব্যারাকের বিভিন্ন ঘরে তুলে ধরেছিল অপরাধ ও শাস্তির অজানা ইতিহাস

সকল ছটায় সময় অপিনার সেলের গেট খুলে যাবে। আপনাকে সেল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে মাঠে। সেখানে কিছুক্ষণ ব্যায়াম করানো হবে। তারপর দেয়া হবে চা বিস্কুট। খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ বসার সুযোগ পাবেন। সাড়ে সাতটায় দেয়া হবে প্রাতরাশ। তারপর আবার আপনাকে সেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে সেলের দরজা এবার খোলাই থাকবে। জেল কতৃপক্ষের দেয়া জিনিসগুলো নিয়ে আপনাকে যেতে হবে সেই স্টোর রুমে, যেখানে জমা আছে আপনার জিনিসপত্র। তালিকা মিলিয়ে আপনার জিনিস ফেরত দেবেন কারাকর্মীরা। আপনার থেকে নিয়ে নেয়া হবে আপনাকে দেয়া জিনিসগুলো। এরপর একজন শক্ত চোয়ালের পুলিশ অফিসার আপনার হাত ধরে প্রধান ফটকের কাছে ছেড়ে দিয়ে বলবেন, ভবিষ্যতে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়াবেন না। তারপর তার নির্দেশে খুলে যাবে সাঙ্গারেভিড় জেলের গেট। জীবনে প্রথমবার মুক্তির স্বাদ পাবেন আপনি। মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে এই সব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন মাত্র ২৪ ঘন্টায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *