গণমাধ্যম ও আমাদের সমাজ

গণমাধ্যম ও আমাদের সমাজ

ফিচার স্পেশাল স্লাইড

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২২ ৪:৫৫ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান (শাশ্বত মনির)

একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের যত একক শক্তি আছে তার সবক’টি শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের শক্ত কাঠামো তৈরি হয়। তার মধ্যে স্বাধীন গণমাধ্যম একটি। উন্নয়ন ও গণমাধ্যম- এ দুটি শব্দের উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি অপরটি ছাড়া ভারসাম্যহীন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সাথে গণমাধ্যমের নিবিড়তম সম্পর্ক রয়েছে। গণযোগাযোগ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে উপেক্ষা করে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি অসম্ভব। এমনকি কাঙ্ক্ষিত সমাজ গঠনের চিন্তাও হবে অদূরদর্শী। তাই গণমাধ্যম অপরিহার্য, অপরিহার্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।

সার্বিক দিক বিবেচনায় আধুনিক গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মূলত সংবাদপত্র আর সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দের প্রতিফলন ঘটে। তাই আধুনিককালে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিভুও বলা হয়।

মূলত সংবাদকর্মীরা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, প্রয়োজন ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। গণমাধ্যম তার স্ফূরণ ঘটাতে সহায়ক হয়। আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি, সরকার বা রাষ্ট্রের। কোনো অবহেলিত ও অনগ্রসর জনপদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রতিকার লেখনির মাধ্যমে চিহ্নিত করতে সংবাদকর্মী ও সংবাদপত্রের ভূমিকার গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আধুনিক প্রচার মাধ্যম সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সুবিধাবঞ্চিত জনপদ ও নাগরিকদের আধুনিক ও সমৃদ্ধ মানুষে পরিণত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আর গণমাধ্যমই পারে মানুষকে নতুন নতুন চিন্তা, ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে।

অতীতে সাংবাদিকতার পরিসর সীমিত থাকলেও আধুনিকতাত্তোরকালে তা শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার কারণে আমাদের দেশে অনেক সময় সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং গণমাধ্যমকর্মীরা বারবার জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফলে তাদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে নানাবিধ অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা, বাধা-প্রতিবন্ধকতা আর সংকীর্ণতা সত্ত্বেও আমাদের দেশের সংবাদকর্মী ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ইতিবাচকই বলতে হবে।

গণমাধ্যমের বহুমাত্রিক ভূমিকা এবং গণমাধ্যম ও উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়। এ জন্য রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদ মাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার চালিকাশক্তি। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা, অর্জন, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দ প্রতিফলিত হয়। গণমাধ্যমকে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতিনিধি বলা চলে।

একজন নির্ভীক সংবাদকর্মী হলেন সমাজের নির্মাতা। সে গণমানুষের চাহিদা ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার পর সরকার বাস্তবায়ন করে। একটি অবহেলিত জনপদের খবর লেখনির মাধ্যমে সভ্যতার উচ্চতায় নিতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ভূমিকার বিকল্প নেই। নিজের স্বার্থ না দেখে গণমানুষের জন্য নিঃস্বার্থে কাজ করাই একজন নির্ভীক সংবাদকর্মীর কাজ। গণমাধ্যম সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে। সুবিধাবঞ্চিত জনপদের নাগরিকদের আধুনিক উন্নত সমৃদ্ধ মানুষে পরিণত করে। একমাত্র গণমাধ্যম পারে মানুষকে নতুন নতুন চিন্তা, ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত তথ্য সরবরাহ করে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। আজকের যুগে গণমাধ্যম শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, লাইফ স্টাইল, রেসিপি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। নানা সীমাবদ্ধতা আর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও গণমাধ্যম সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করছে। সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন-শক্তিশালী সে দেশে গণতন্ত্র উন্নত এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়ে থাকে।

সারাবিশ্ব ধীরে ধীরে, কখনও কষ্ট করে হলেও বুঝছে, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দরকার। উন্নয়নের জন্য যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কৃষি উন্নয়ন বা ভালো শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, তেমনি স্বাধীন গণমাধ্যম দরকার। জাতিসংঘও এটি উপলব্ধি করতে পেরেছে তাদের সাম্প্রতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় তা উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রকে যদি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়, তাহলে তাদের এমন গণমাধ্যম থাকতে হবে, যারা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। উন্নয়নের জন্য যে দাম দিতে হয়, এটা তারই অংশ। আশার কথা হচ্ছে- বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও গণমাধ্যম শক্তিশালী হচ্ছে।
আমাদের দেশে এখনও সাড়ে ৪ কোটির ওপর লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দরিদ্র লোকের বঞ্চনা অনেক বেশি, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ খুব কম। উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম শর্ত হচ্ছে জ্ঞান সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদেরকে আগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। যাদের তথ্যভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ, তাদের ক্ষমতায়ন তত বেশি।

গণমাধ্যম মানুষের মনোজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রেক্ষাপটে মিডিয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বদলে দিতে পারে। যেমন- বিগত শতকের ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার ঊষালগ্ন পর্যন্ত জাতীয় জাগরণে জনগণের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল তখনকার প্রায় সব প্রিন্ট মিডিয়া। জনগণ ও গণমাধ্যমের এমন অবিভাজ্য ঘনিষ্ঠতা বাঙালির ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। তখন নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর মালিকানা ছিল সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের হাতে।

স্বাধীনতা যুদ্ধেও বিশেষত বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে মিডিয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতার প্রারম্ভিক কয়েক বছর পর পুনরায় মিডিয়া বিকশিত হতে শুরু করে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে। অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও ব্যক্তি খাতের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের ব্যাপক সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল।

বিগত দশকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর সূচনার মাধ্যমে মিডিয়ার ল্যান্ডস্ক্যাপ বা ভূমিতলের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে যাদের সংবাদপত্র বা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সুবিধা নেই, তারা এখন এফএম রেডিওর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংবাদ জানতে পারছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ও এর ভয়ানক প্রভাব সম্পর্কে প্রিন্ট মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এটাকে অন্যতম বড় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ফলে সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষত ইউনিসেফ, ডব্লিওএইচও ও বিশ্বব্যাংক এগিয়ে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার এটাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছিল সংবাদপত্রের প্রচার-প্রচারণায় বাধ্য হয়ে।

পরিবেশ ও নদী রক্ষার আন্দোলনেও গণমাধ্যম জোরালোভাবে এগিয়ে এসেছে। অনুরূপভাবে আমরা দেখি, এসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং, গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ে ও ফতোয়া জারির বিরুদ্ধে মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন ও জনসচেনতা বেড়েছে। ফলে এসিড সন্ত্রাস এখন অনেকাংশে কমে এসেছে। ইভটিজিং নেই বললেই চলে।

পরিশেষে বলতে চাই, গণমাধ্যম হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো নিখুঁত ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। তাতে রাষ্ট্রের পক্ষে তার প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন সহজতর হবে এবং সরকার অধিক জনকল্যাণমুখী ও গণমুখী হতে বাধ্য হবে। একটি দেশের গণমাধ্যম যতটা শক্তিশালী হবে সে দেশের উন্নয়ন ততটা টেকসই হবে। কেননা সমাজ ও গণমাধ্যমকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান (শাশ্বত মনির) : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক শীর্ষ খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published.