করোনার তৃতীয় ঢেউ ঠেকানো কঠিন, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

করোনার তৃতীয় ঢেউ ঠেকানো কঠিন, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

স্পেশাল স্বাস্থ্য

মে ১৮, ২০২১ ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ

দেশের মানুষ যেভাবে কোভিড-১৯ বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করছে তাতে সামনে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

আগামী কিছুদিন আমাদেরকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। ঈদ শেষে মানুষ যেন আগামী কিছুদিন ঢাকায় ফিরতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

সোমবার (১৭ মে) দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদ পরবর্তী আলোচনা সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এদিকে, কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় ৪৩টি অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে চারটি কেনা হয়েছে আর সেগুলো জুলাই নাগাদ পৌঁছাবে কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে। বসানো হবে সরকারি কোভিড হাসপাতালে। প্রতি সেট প্ল্যান্ট নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজের সরবরাহ করবে এক হাজার শয্যার বলে জানা গেছে।

সারাবিশ্বে উদ্বেগের হয়ে দাঁড়ানো করোনার চারটি ভ্যারিয়েন্ট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে ২০০ জন কোভিড-১৯ রোগীর নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে চারটি ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। সোমবার (১৭ মে) আইইডিসিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

দেশে এখন পর্যন্ত পাওয়া চারটি ভ্যারিয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে- বি.১.১.৭ (ইউকে ভ্যারিয়েন্ট), বি.১.৩৫১ (সাউথ আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট), বি.১.৫২৫ (নাইজেরিয়া ভ্যারিয়েন্ট), এবং বি.১.৬১৭.২ (ইন্ডিয়া ভ্যারিয়েন্ট)।

এরমধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে পরিচিত বি.১.৬১৭ ভ্যারিয়েন্টও রয়েছে। প্রতিবেশী দেশটিকে বিপর্যস্ত অবস্থায় ফেলে এটি এখন বিশ্বের নানা স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু, এ অবস্থাতেও বাংলাদেশে বিধি-নিষেধ শিথিল করা হয়েছে, সামাজিক দূরত্ব মানতে মানুষের অনীহা দেখা যাচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচিও অনিশ্চিতয়তার মধ্যে পড়েছে। ফলে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ঈদুল ফিতরের আগে সরকার করোনা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ শিথিল করে। তবে, মানুষের ঈদযাত্রা ও ফেরায় গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়। এরপরও গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে লাখো মানুষ রাজধানী ছাড়ে। আবার সেই পথেই তারা সেভাবে ফিরে আসছে ঢাকায়।

এখন পর্যন্ত দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাত্র দুই শতাংশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার দুই ডোজ পেয়েছেন। প্রথম ডোজ পেয়েছেন চার শতাংশের কম লোক। ভ্যাকসিন সংকটের কারণে সরকার প্রথম ডোজ দেওয়া স্থগিত রেখেছে। প্রথম ডোজ পাওয়া প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এখন দ্বিতীয়টি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ইতোমধ্যে টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪ লাখের বেশি ডোজের ঘাটতি রয়েছে। কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন পর্যন্ত মোট ৩৭ লাখ ৮৩ জন করোনার টিকার দুই ডোজ পেয়েছেন। প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ জন। টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারত ও নেপালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতে এখন মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সায়েদুর রহমান খসুর বলেন, কয়েক সপ্তাহ পর সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আবারও চাপে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্যে আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। বলেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে কোভিড রোগীদের জন্য এক হাজার ১৭১টি আইসিইউ এবং ১১ হাজার ৯৯১টি সাধারণ বেড রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মো. সায়েদুর রহমান জানান, হাতে আছে ছয় লাখ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার, ৫ লাখ সিনোফার্মের ভ্যাকসিন আছে আর দেশের ভূখণ্ডে এক লাখ ফাইজার আসবে বলে আমরা শুনতে পাচ্ছি। এ রকম একটা অবস্থার আমাদের জন্য অবশ্যই ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম খুবই হতাশা।

সায়েদুর রহমান মনে করেন, ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের উচিত প্রতিটি জেলা হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শহরগুলোর সব হাসপাতালে অক্সিজেন জেনারেটরের ব্যবস্থা করা। রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্যে এই সময়ের মধ্যে সরকারের কয়েকটি ফিল্ড হাসপাতালও তৈরি করা উচিত বলে মত দেন তিনি।

অধ্যাপক সায়েদুর বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, বিশেষত মাস্ক পরার বিষয়টি সরকারকে কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে, যেহেতু করোনাভাইরাস পরিবর্তিত হতে থাকে এবং এরইমধ্যে বিশ্বের সব উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, সেহেতু এখানে একটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ভ্যারিয়েন্ট আরও মারাত্মক হতে পারে।

যে চারটি ভ্যারিয়েন্টকে ‘বৈশ্বিক উদ্বেগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে চতুর্থটি হচ্ছে ভারতে প্রথম শনাক্ত হওয়া বি.১.৬১৭। অন্য তিনটি দ্রুত ছড়ানো ও মারাত্মক ভ্যারিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হয় যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে।

স্বাস্থ্যবিধি না মেনে মানুষ যেভাবে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে যাচ্ছে, তাতে ঈদের পর বাংলাদেশে ভারত ও নেপালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সম্প্রতি সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, মানুষ বেপরোয়াভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঈদের পর ভারত ও নেপালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বাংলাদেশে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, টিকা সংকট, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা ও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দেশে ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

ঈদের ফিরতি যাত্রা নিরাপদ না করলে করোনার তৃতীয় ঢেউ ঠেকানো যাবে না বলে সতর্ক করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে- নজীর আহমেদ। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করার তাগিদ দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সারা দেশের বিভিন্ন জায়গাতে সংক্রমণটা যাবে এতে সন্দেহ নেই এবং তার সঙ্গে যদি ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট যুক্ত হয় সেটার আমরা বৃদ্ধি দেখব। যারা গেছেন তারা তো ফিরবেই। তাই ফেরার ক্ষেত্রে যেন এমনটা আবার না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও লাগাম টানা যাবে সংক্রমণের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানউর রহমান বলেন, ঈদের পর নতুন ওয়েব হবে কিনা, এটা হওয়ার খুবই সম্ভাবনা আছে। আল্লাহ আমাদের এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছে যেভাবে, সেভাবে যদি বাঁচিয়ে দেয় তাহলে হয়তো নাও হতে পারে। অন্যথায় একটা ধাক্কা আমাদের আসার কথা। ফেরার পথে সেই সঙ্গে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানউর রহমান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল) পরিচালক ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন বলেন, আমরা চাচ্ছি কোভিড হাসপাতাল বিশেষ করে ঢাকা মহানগর ছাড়াও ঢাকার বাইরে মহানগরে অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট দেয়ার চেষ্টা করা হবে। সব অক্সিজেন জেনারেটর স্থাপন হলে সরবরাহের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপরই জোর দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.