কচ্ছপের অভিশাপে যে গ্রামের মানুষ জন্ম থেকেই খর্বাকৃতির

কচ্ছপের অভিশাপে যে গ্রামের মানুষ জন্ম থেকেই খর্বাকৃতির

ফিচার

মে ২৬, ২০২১ ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

রূপকথার সেই লিলিপুট আর গালিভারসের গল্প মনে আছে কি? যেখানে গালিভারস পৌঁছে গিয়েছিল এক লিলিপুটের দেশে। যেখানে মানুষগুলো মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা। আজব সেই দেশে গালিভার আর লিলিপুটদের সঙ্গে ঘটেছিল মজার মজার সব কাণ্ড। তবে বাস্তবে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বিশ্বে সর্বত্র উচ্চতায় খাটো ‘বামন’ মানুষদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হয়। অথচ এই মানুষগুলো বেশ কিছু প্রজাতির মানুষ জিনগত কারণেই উচ্চতায় খাটো। কিন্তু আমাদের মতো তথাকথিত উচ্চতা সম্পন্ন মানুষের উপেক্ষা ও বিদ্রুপের পাত্র হয়েই এনারা থেকে গিয়েছেন।

এশিয়া মহাদেশেই একটি গ্রাম আছে যেখানে অদ্ভুতভাবে মানুষজন বামন হয়ে জন্ম নেয়। ইরানের পূর্ব খোরাসান প্রদেশের অনন্য এক প্রাচীন গ্রাম মাখুনিক। রহস্যময় এই গ্রামটি লিলিপুটদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। স্থাপত্যের দিক দিয়েও গ্রামটি অসাধারণ। বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যতম গ্রামের মধ্যে এটি অন্যতম। গ্রামটি প্রায় এক হাজার ৫০০ বছরের পুরনো বলে জানা যায়। ইরান-আফগানিস্তান সীমান্ত ঘেঁষে দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের সারবিশেহ কাউন্টির পল্লী জেলা দোরেহতে যার অবস্থান।

গালিভার ট্রাভেলস রূপকথায় গল্প

গালিভার ট্রাভেলস রূপকথায় গল্প

এখানকার মানুষের স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষের চেয়ে কমপক্ষে ৫০ সেন্টিমিটার খাটো। এখানকার বাসিন্দারা আফগানিস্তানের নাগরিক। বেশ কয়েকশ বছর আগে তারা সেখানে এসে বসবাস শুরু করে। অতীতে এখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই উচ্চতায় এক মিটারের বেশি লম্বা হয় না বললেই চলে।

তবে চীনের একটি গ্রামের নাম ইয়াংসি। সিচুয়ান প্রদেশের এই গ্রামের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বামন। মজার ব্যাপার হল অন্যান্য অঞ্চলে জন্ম নেয়া বামনরা একত্রে বসবাস করবে বলে এই গ্রামে এসে আস্তানা গড়ে তুলেছেন, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন নয়। তারা এই গ্রামেতেই জন্মগ্রহণ করেছেন।

এখানকার মানুষের ধারণা কচ্ছপের অভিশাপেই তাদের এই অবস্থা

এখানকার মানুষের ধারণা কচ্ছপের অভিশাপেই তাদের এই অবস্থা

এখানকার মানুষের গড় উচ্চতা ৪ ফুট ধরা হয়। কিন্তু এই গ্রামের বামন’দের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম যার উচ্চতা তা সে হলো মাত্র ২ ফুট ১ ইঞ্চি। এই ঘটনা অনেক দিনের হলেও প্রথম নজরে আসে ১৯৫১ সালে। আশ্চর্যজনক বিষয়টি হল এই ব্যাপারটি অদ্ভুতভাবে বংশানুক্রমিক ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এখানকার মানুষ জনের মধ্যে এরকম উচ্চতা কম হওয়ার বিষয় নিয়ে চীন সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করে। কিন্তু সেই কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কারণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেনি। তবে এই গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে উচ্চতা কম হওয়া নিয়ে বেশকিছু ধারণা কাজ করে।

এখানকার বাসিন্দাদের দাবি এই গ্রামে ওয়াং নামে এক ভদ্রলোক বসবাস করতেন। তিনি একবার অদ্ভুত পা’ওয়ালা কালো রঙের এক কচ্ছপ দেখতে পান। এই ব্যক্তির কাছ থেকে খবর পেয়ে গ্রামের সবাই ওই কচ্ছপ দেখার জন্য ভিড় করে। তখন অনেকে বলেছিল প্রাণ রক্ষার তাগিদে একটিকে ছেড়ে দেয়া হোক। আবার অনেকের দাবি ছিল একে মেরে ভুরিভোজ করা হয় যেন। শেষ পর্যন্ত এই অদ্ভুত দর্শন কচ্ছপটির ওপর নিদারুণ অত্যাচার করে গরম আগুনে ঝলসে খাওয়া হয়। তারপর থেকেই নাকি এই গ্রামে এরকম খর্বাকৃতির মানুষ জন্ম নেয়া শুরু হয়।

১৯৫১ সালে এই গ্রামের মানুষের কথা বিশ্বের সামনে আসে

১৯৫১ সালে এই গ্রামের মানুষের কথা বিশ্বের সামনে আসে

এখানকার বাসিন্দাদের অভিমত সেদিন ওই কচ্ছপটির সঙ্গে যে নির্মম আচরণ করা হয়েছে সেই অভিশাপেই নাকি এখানকার মানুষজন বামন হয়ে জন্ম নিচ্ছেন। বর্তমানে ইয়াংসি গ্রামটি বিশ্বের দরবারে ‘খাটো মানুষের দেশ’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। শারীরিক অক্ষমতার জন্য ইয়াংসি গ্রামের খাটো মানুষেরা প্রবল কষ্টে দিন কাটাত। যদিও বর্তমানে চীন সরকারের উদ্যোগে তাদের দুঃখ কষ্ট দূর হবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপাতত তারা দীর্ঘদিন সরকারি অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকার পর চীন সরকার এই গ্রামটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়ার পাশাপাশি এখানে একটি বিনোদন পার্ক তৈরি করে। ওই বিনোদন পার্কে মূলত এখানকার বামন মানুষেরাই কাজ করেন।

গ্রামটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়ার পাশাপাশি এখানে একটি বিনোদন পার্ক তৈরি করা হয়েছে

গ্রামটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়ার পাশাপাশি এখানে একটি বিনোদন পার্ক তৈরি করা হয়েছে

বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য অনুসন্ধানকারীরা গ্রামটিতে পরিদর্শনে যান সরেজমিনে তদন্ত করে এমন অস্বাভাবিক ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার জন্য। তারা সম্ভাব্য সব রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন; যেমন– তাদের শরীরের বিভিন্ন রকম পরীক্ষা করা হয়, ঐ এলাকার পানি, মাটি, এমনকি শস্যগুলোও নিরীক্ষা করে দেখা হয়। তারা ধারণা করেছিলেন, মাটিতে হয়ত অতিরিক্ত মাত্রায় পারদের উপস্থিতি রয়েছে, যার কারণে তা শরীরে এমন প্রভাব ফেলছে। কিন্তু মাটি পরীক্ষা করে এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি গ্রামের প্রত্যেক খর্বাকৃতির মানুষকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দেখা হয়। কিন্তু সেরকম কোনো প্রমাণ মেলেনি, যাতে করে বিজ্ঞানীরা সেই কারণকে এমন অস্বাভাবিকতার যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন। ধোঁয়াশাতেই রয়ে গেল পুরো ব্যাপারটি, জানা গেল না প্রকৃত কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.