উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ শিগগিরই

উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ শিগগিরই

আদালত স্লাইড

এপ্রিল ২১, ২০২২ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

মামলার জট কমাতে শিগগিরই উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য ইতোমধ্যে বিচারকদের ১০ থেকে ১৫ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে।

এ তালিকায় আইনজীবী ছাড়াও কয়েকজন জেলা জজের নাম রয়েছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে বা পরে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের অক্টোবরে ৯ জন বিচারককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিচারক নিয়োগে আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তারা বলেছেন, আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করার পর নিয়োগ দিতে হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে কোনো আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। যদিও সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের (গ) ধারায় স্পষ্ট আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে। বিচারক নিয়োগে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অদ্যাবধি সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

ফলে এ পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন উঠছে, তারও সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে বিচারক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যোগ্যতর ব্যক্তিকে বাছাই করার স্বার্থে বিচারপতি নিয়োগে আইন করা জরুরি। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই তা উপেক্ষা করেছে।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, হাইকোর্টে কিছু বিচারক নিয়োগ দেওয়ার কাজ চলছে। কবে নাগাদ এ নিয়োগ দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশা করছি ঈদের আগে অথবা পরে সম্পন্ন হবে। নীতিমালা প্রণয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন-নীতিমালা নয়, করতে হলে আইন করতে হবে, দেখছি কী করা যায়।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, হাইকোর্ট বিভাগে অন্তত ১৫ জন বিচারপতি নিয়োগের খসড়া তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকা আরও ছোট হতে পারে। এতে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়াও কয়েকজন জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার রয়েছেন। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এ নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

অবসর ও মৃত্যুজনিত কারণে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে বিচারক সংকট রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি বিচারপতি নাজমুল আহাসানসহ হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত চার বিচারপতিকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। এতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ জনে। এর মধ্যে তিনজনকে বিচারকাজ থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখা হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট থেকে।

এদিকে আপিল বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত চার বিচারপতির মধ্যে বিচারপতি বোরহান উদ্দিন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ গত ৯ জানুয়ারি শপথ নেন। তবে বিচারপতি নাজমুল আহাসান করোনায় সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় সেদিন শপথ নিতে পারেননি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নাজমুল আহাসান ইন্তেকাল করেন। বর্তমানে আপিল বিভাগে সাতজন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী দীর্ঘ ছুটিতে থাকায় সেখানে মাত্র ৬ জন বিচারপতি এখন বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। দেশে বর্তমানে ৪০ লাখের উপরে মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগে ৬ লাখের বেশি মামলা রয়েছে। প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়ছে। তবে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী গত ২ জানুয়ারি দায়িত্বগ্রহণ করেই বিচার বিভাগকে মামলাজট থেকে মুক্ত করতে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র ১ হাজার ৯০০ জন বিচারকের কাঁধে যে বিপুল পরিমাণ মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে, তা বিচার বিভাগের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। পরে তিনি অধস্তন আদালতে মামলা জট নিরসনে আটটি বিভাগের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারপতিকে প্রধান করে আটটি মনিটরিং সেল গঠন করেন।

সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগ বিষয়ে বলা আছে। ৯৫ (১)-এ বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতিকে নিয়োগদান করবেন।’ ‘৯৫(২) অনুসারে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হলে এবং (ক) সুপ্রিমকোর্টে অন্যূন ১০ বছর অ্যাডভোকেট না হয়ে থাকলে, বা বাংলাদেশের (খ) রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অন্যূন ১০ বছর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠান না করে থাকলে, অথবা (গ) সুপ্রিমকোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলে, তিনি বিচারপতি পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।’

২০১২ সালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। পরে খসড়া নীতিমালা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল খসড়া নীতিমালায়। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের বিচারক নিয়োগের বিধান অনুসরণ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি, অভিজ্ঞ আইনবিদসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করে খসড়াটি প্রণয়নও করা হয়েছিল। কিন্তু তা চূড়ান্ত হয়নি।

২০০৯ সালের ২ মার্চ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে জোট সরকারের সময়ে বাদ পড়া ১০ বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। এতে বলা হয়, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ গ্রহণ সাংবিধানিক রেওয়াজ। এ রেওয়াজ সাংবিধানিক রীতিনীতিতে পরিণত হয়েছে। এটা আইনের শাসনের অংশ, বিচারক নিয়োগ ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ বা মতামত প্রাধান্য পাবে। তবে তাদের পেশাগত যোগ্যতা ও উপযুক্ততা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের মতামত নেওয়া হবে। এছাড়া বিচারক নিয়োগে একটি নীতিমালা করার জন্য উচ্চ আদালত থেকে বিভিন্ন সময় একাধিক মতামত আসে।

২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগ উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে সাত দফা নির্দেশনা দেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দেন। এতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতিকেই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তাকে প্রয়োজনে বিচারক নিয়োগের জন্য আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন করে জ্যেষ্ঠ বিচারকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতি যে মতামত দেবেন, তা অগ্রাহ্য করা যাবে না, যদি না সুপারিশকৃত ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে সম্পৃক্ত থাকেন।

এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী বলেন, ‘উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের বিষয়টি বিচার বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু বিচারক নিয়োগ নিয়ে ওই রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে আইন বা নীতিমালা করাটা জরুরি। এটা করলে ক্ষতি নেই বরং লাভ। তিনি বলেন, আমি আইনমন্ত্রী থাকার সময়ে বিচারপতি নিয়োগে নীতিমালা চূড়ান্ত খসড়া করেছিলাম।

এরপর কী হলো জানা নেই। বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি বিচারক নিয়োগ দেন। এখানে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিলে বিতর্কের কোনো সুযোগ থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.