অদ্ভুত শখের টানে আরবের শেখরা ভিড় জমান পাকিস্তানের এই ছোট্ট শহরে

অদ্ভুত শখের টানে আরবের শেখরা ভিড় জমান পাকিস্তানের এই ছোট্ট শহরে

ফিচার

বছরে দুই একবার রীতিমতো লাইসেন্স নিয়ে পাকিস্তানের পাঞ্চগুরে আরবের শেখেদের ভিড় জমে। সেই লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে মাত্র ১০ দিন। আবার পাঞ্চগুরে যাওয়াও বেশ কসরতের ব্যাপার। দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ছোট্ট উপকূলীয় শহর পাসনি থেকে প্রশিক্ষিত গাইড নিয়ে বিশেষ জীপে যেতে হবে সেখানে। আরব শেখেরা এসব কষ্টের ধারই ধারেন না। কার্য হাছিল করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। কাজ বলতে শখের বশেই এখানে আসেন তারা। আর সেটা হচ্ছে পাখি শিকার করা।

খানিকটা অবাক হলেন নিশ্চয়? অনেকের হয়তো কপালের চিন্তার ভাঁজ কিছুটা দীর্ঘ হয়েছে। বিশেষ একটি পাখি শিকারেই শেখেদের পদচারণা পাকিস্তানের এই ছোট্ট শহরটিতে। প্রতি বছর ‘হুবারা বাস্টার্ড’ নামে বিশেষ এক ধরনের পাখির জন্য হন্যে হয়ে পাকিস্তান ছুটে যান আরব বাদশাহ-যুবরাজরা। বলতে গেলে পাকিস্তানের পরিযায়ী এই পাখিটির জন্য পাগল প্রায় আরব রাজ পরিবারের সদস্যরা। এই পাখি শিকার  করতে গিয়ে তারা তোয়াক্কা করেন না নিরাপত্তা ঝুঁকি বা কোটি কোটি টাকা খরচের ব্যাপারেও।

পাখি শিকার করাই তাদের উদ্দেশ্য

পাখি শিকার করাই তাদের উদ্দেশ্য

পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সম্পদ রক্ষায় বিশেষ আইনও প্রয়োগ করেছেন। প্রতিটি লাইসেন্সের আওতায় ১০ দিন শিকারের সুযোগ থাকবে। এই সময়টাতে অনুমতি রয়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি হুবারা বাস্টার্ড মারার। কিন্তু অনেক আরব শেখরা মানেন না এই বিধি-নিষেধ।  ২০১৪ সালে এক সপ্তাহে শিকার করেছিল দুই হাজারেরও বেশি পাখি। তবে এই পাখিটি যে পাকিস্তানের আঞ্চলিক পাখি তা কিন্তু নয়। হুবারা বাস্টার্ড তাদের কাছে অতিথি। এদের মূলত দেখা যায় মঙ্গোলিয়া ও তার প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে। প্রতি শীতে পাকিস্তানে পাড়ি জমায় তারা, থাকে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। হুবারা পাখির আকার অনেকটা টার্কির মতোই বড়। এই পাখি মানুষের চোখের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করে। অবিরাম শিকারের ফলে এদের সংখ্যা কমে আসছে।

দল বেঁধে রাজ পরিবারের সদস্যরা আসেন এই পাখি শিকারে

দল বেঁধে রাজ পরিবারের সদস্যরা আসেন এই পাখি শিকারে

আরব শেখদের বিশ্বাস এই পাখির মাংস আয়ু  ও যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে। তাই যতো ঝুঁকি আর খরচই হোক পাখিটি শিকারে মরিয়া থাকে আরব ধনীরা। এই শিকারে আগ্রহীদের তালিকায় সবার উপরে থাকে সৌদি, কাতার এবং আরব আমিরাতের রাজ পরিবারের সদস্যরা। বিলুপ্ত প্রায় বলে পাকিস্তানের হুবারা বাস্টার্ড শিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আরবদের ধারণা হুবারা পাখি তাদের যৌনশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে

আরবদের ধারণা হুবারা পাখি তাদের যৌনশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে

১৯৩০ সালের কথা। দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ছোট্ট উপকূলীয় শহর পাসনিতে হাজির হলেন দু’জন সেনা অফিসার। তারা একটি কার রেন্টাল সার্ভিসের দোকানে গাড়ি দাঁড় করালেন। একজন দোকানের মালিককে প্রশ্ন করলেন, আপনাদের কাছে ভাল গাড়ি আছে? একজন আরব শেখকে পাঞ্চগুর নিয়ে যেতে হবে। মালিক তার ছেলে হানিফকে পাঠালেন গাড়ি দেখানোর জন্য।

প্রশিক্ষিত বাজপাখি দিয়ে শিকার করা হয় পরযায়ী এই পাখিটি

প্রশিক্ষিত বাজপাখি দিয়ে শিকার করা হয় পরযায়ী এই পাখিটি

ঐ গাড়িটি ভাড়া করা হয়েছিল প্রিন্স সুরুর বিন মোহাম্মদ আল-নাহিয়ানের জন্য। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ছয় রাজ পরিবারের একটির সদস্য প্রিন্স সুরুর। প্রিন্স এসেছিলেন হুবারা বাস্টার্ড পাখি শিকারের জন্য। রাজপরিবারের সদস্যদের গাইড হিসেবে হানিফ পাঞ্চগুরে গেছেন বহুবার। তবে এবার তিনি সংগ্রহ করলেন জীবনের অন্যতম এক অভিজ্ঞতা। প্রিন্স সুরুর বিন মোহাম্মদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে হানিফের বন্ধুত্ব হয়ে যায় গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পরই। এখনো প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়টাতে হাজি হানিফ বালোচিস্তান প্রদেশের শিকারের জায়গাতে আরব রাজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যান।

রাজ পরিবারের যুবরাজ ছোট থাকতেই এই পাখি শিকারের প্রশিক্ষন নিতে থাকে

রাজ পরিবারের যুবরাজ ছোট থাকতেই এই পাখি শিকারের প্রশিক্ষন নিতে থাকে

হুবারা পাখি শিকার করা আরব শেখদের জন্য একটি ব্যক্তিগত বিনোদন মাত্র। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তারা এই পাখি শিকার করেন না। হুবারা শিকার করার রয়েছে বিশেষ এক উপায়। প্রশিক্ষিত বাজ পাখি দিয়ে শিকার হয় হুবারা। ঐতিহ্যগতভাবে হুবারা পাখি শিকার করতে বাজপাখি ব্যবহার করা হয়। বাজপাখি হুবারা ধরে আনার পর সেগুলো জবাই করা হয়। শিকারিরা বন্দুকও ব্যবহার করতেন। তবে ইদানীং বৈধ শিকার বেড়ে যাওয়ায় কেয়ারটেকাররা জাল দিয়ে হুবারা ধরে এবং শিকারি দল এসে পৌঁছানোর পর সেগুলো আকাশে ছেড়ে দেয়া হয় বাজপাখির জন্য।

হাজি হানিফ

হাজি হানিফ

সেই স্থানটিকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে অত্যান্ত বিলাসবহুল অবস্থায়। বাড়ির সামনে সাইনবোর্ডে আবুধাবির রাজপরিবারের সরকারি মনোগ্রাম। ঐ এলাকার মরুময় গরিব এলাকার মাঝখানে বাড়িটি যেন একটা মরূদ্যান। অবশ্য ১৯৭০ দশকে শিকারি দলগুলো হুবারা পাখি যেখানে পড়তো সেখানেই ক্যাম্প বসাতো। এসব শিকার অভিযান চলতো এক সপ্তাহ ধরে। শিকারীরা ক্যাম্পেই সেই পাখির মাংস দিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে শিকার শেষে শহরে ফিরে আসতো।

তবে বালোচিস্তানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছিল। তখন নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আরব শেখরা আর খোলা মরু প্রান্তরে রাত কাটাতেন না। এখন তারা হোটেলে বা কেয়ারটেকারদের বাড়িতে থাকেন এবং কাছাকাছি জায়গায় গিয়ে শিকার করেন।

আরবের রাজ পরিবারগুলোতে নিজস্ব প্রশিক্ষিত বাজ পাখি থাকে

আরবের রাজ পরিবারগুলোতে নিজস্ব প্রশিক্ষিত বাজ পাখি থাকে

হুবারা বাস্টার্ড, যার অন্য নাম এশিয়ান হুবারা, শিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এক সময় আরব উপদ্বীপে এই পাখি প্রচুর ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা আইইউসিএন-এর হিসেব অনুযায়ী সারা বিশ্বের এখন মাত্র ৫০ হাজার থেকে এক লাখ হুবারা পাখি বেঁচে আছে। সেকারণেই সংস্থাটি হুবারাকে হুমকির মুখে থাকা পাখির লাল তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *